—সাবধান চিল্লাস নি-সাপ্লাই আইয়া পড়বো-বাড়তি ধান থাকলেও যা কমতি থাকলেও তা- দুই পয়সা কম আর বেশী-অতো বেহুশ হোসনি; আমি সব ঠিক কইরা লমু ।
রহিমউদ্দি ফিস্ ফিস্ করে বলে :
—জনপ্রতি আট মণের উপর বোঝাই হয়ে গেছে না? তারা আইলে তো আর উপায় নাই মিঞা ভাই। ঠেলা সামলাইতে তো আমাগো জান লইয়া টানাটানি ।
কসিমের ভীরু আর্তস্বর কেঁপে উঠে। —তুই চুপ কর হারামজাদা। খামকা হাল্লা গোল্লা কইরা মরিস না, আমি সব ঠিক কইরা লমু।
—তুমি কি কইরা লইবা? তারা টাহা লিতে আইবো না? যদি ধইরা লিয়া যায়?
—হে হেলিয়া যাইবো? অতজন লোকের ধান। ছয়-আটে আট চল্লিশ মণ, ধরাক দেখি কেমন অংক জানে-খালি একটা কথা কইলেই হইলো। রহিমের শেষপূর্ণ ভাষায় বিদ্রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠে। তার বুকের পাটা খুব শক্ত । অতো সহজে নুয়ে পড়তে চায় না সে ।
—ওয়াক-ওয়াক ।
আজরের বমি শুরু হয়েছে।
—আল্লাজি গো, তুমি পানাহ দেও, আমাগো! মাইয়াটিরে এক্লা ফালাইয়া আইছি।
—এত সের তেতুল আনলাম বেটা মুখে দিবে না- খালি ওয়াক ওয়াক- এহান কি আমাগো বাঙ্গালা মুলুক, ডাকলেই ডাক্তার আইয়া পড়বো?
রহিমউদ্দির মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে ওঠে।
—ওয়াক-ওয়াক !
আজরের দম বন্ধ হয়ে যায় বুঝি ।
—আরে সব্বনাশ কইরা ফালাইলো! হাড়ির উপর বমি কইরা লইলো- ভাত টাত আর খাওয়া যাইতো না ।
ব্যতিব্যস্ত বাবুর্চি ফুরকান চলতি চুলোর পানে তীরবেগে অগ্রসর হয়।
—আহা, অতো গোলমাল করিস না, ওর বুকটা ভালো কইরা ডলিয়া দে । রহিমউদ্দি ফুরকানকে উপদেশ দেয় ।
আলেক শেখ চোখ রগড়ায় ।
—ইয়া আল্লা, আমার পেটের মধ্যে যে আসমানের ডাক!
ছৈ-এর বাইরে যাবার অবসর পায় না সে। ঘুমন্ত উসমান ও শমসেরের পাশেই তার দাস্ত হয়ে যায়। তার অবশ শরীর গুলী খাওয়া পাখীর মত এলিয়ে পড়ে।
—কি জঞ্জালরে বাবা! এক মিনিট শুইবারও উপায় নাই। বেটা দিলো তো দিলো এক্কেবারে লায়ের মধ্যিখানে।
সদ্য জাগ্রত উসমান মুক ধোয়। শমসের ওঠে বসে
—কি কও মিঞা ভাই, কি করণ লাগবো আমাগো?
—আরে না না, এখনতরি হায়াত আছে। আল্লার কাছে দোয়া কর সকল ভাইরা মিলে ।
রহিমউদ্দি বিব্রত দৃষ্টি মেলে তাকায়। তার চোখ থেকে টপ্প্ করে পানি পড়ে। পাশের নৌকায় ‘ওয়াক-ওয়াক’ শোনা যায়। নৌকায়ই শুরু হয়েছে ‘বল্লার’ বিজয়অভিযান ।
রহিমের সুরে কান্না ফুটে উঠে :
—এই বখাটিয়া হেকিম আলীকে ফালাইয়া দিলো বুঝি যা এতদিনে খতম যতো খকখকানি-এইবার আরাম পাইবো, গাঙের তলা বড় ঠান্ডা- মানুষটার বুকটা পুইড়া খাক্ হইয়া গেছিল আর কি।
ফুরকান রুই মাছের সালোনে শুরুয়া দেবে, শানকিতে পানি ভরতে যায়। খট্ করে কোন্ মুরদার কপালে লাগে ।
—সোনা আল্লাজী গো, মাইরা ফালাইলো!
বলে সে সকল আরোহীকে ঠেলে নায়ের মাঝখানে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেয়। রোগীদের দাস্ত বমিতে ধানগুলো ভিজে চুপসে গেছে। তারই মাঝে মুখ গুঁজে ফুরকান তার দেশের স্বপ্ন দেখে। কচি ধানের চারার মত শ্যামল শান্ত মুখ। জুলফির গোছা কানের কাছে নেমে কি আকুল আগ্রহে সে কোমল মুখখানাকে আলিঙ্গন করেছে, যেন সাদা ধবধবে নদীর কুলে দুর্বাঘাসে ভরা এককাঠা জমি। বিদায় বেলা রহিমন আবদার করেছিলো।
—আট মণ আনলে অইবো না, আরও বেশী আনিও। একট চাঁদ বালি গড়াইয়া লমু ।
সে বেশী ধান রোজগার করতে পারেনি। এই তো মোটে দশ মণ। পথের খর্চে বাড়তি দুই মণ চলে যাবে। তারপর কোন্ মুখ নিয়ে সে দাঁড়াবে সেই অভিমানী নারীর সামনে? লাশগুলো এভাবে ফেলে দেওয়া শমসেরের ভালো লাগে না ।
রহিমউদ্দিকে উদ্দেশ্য করে বলে :
—ফালাইয়া দিলে তো মিঞা ভাই মাথা গুণতিতে কমতি ধরা পড়বো না? তহনে কি করবা? হাতকড়া লাগাইয়া পাঠাইয়া দিবো না সুনামগঞ্জ?
রহিম মাথা দোলায় ।
—তুই মর বড় আহাম্মক, আগে বুঝি ওনাদের সঙ্গে বন্দোবস্ত কইরা লইনাই?
—আচ্ছা, তা হইলে হেকিম আলীর ধানগুলি কি হইবো? শমসের প্রবীণ লোকের মত প্রশ্ন করে।
—হইবো আর কি? ওরা দেশে লিয়া যাইবো ।
—ওর মাগপোরে দিবো না?
—দিতে নাও পারে, পথেও তো খর্চ হইবো ।
ফুরকানউল্লার চোখ দু’টো ভাবনায় চড়ক গাছের আকার ধারণ করে ।
—ওয়াক-ওয়াক !
সারি বাঁধা নৌকাগুলো ‘ওয়াক-ওয়াক’ রবে মুখর হয়ে ওঠে। জীবন নিয়ে আজরাইলে আর মানুষে টানাটানি পুরোদমে শুরু হয়েছে। জীবনের খেলার পরিবর্তে জীবন নিয়ে খেলা ।
দাঁড়ের পাশে ফরমানউল্লাহ এক-দুই-তিন বার দাস্ত। স্তিমিত জীবন-প্রদীপ আঁধারে হারিয়ে যায় বুঝি। অতি কষ্টের উচ্চারণ, জিগর-ছেঁড়া আবেদন নদীর বুকে প্রতিধ্বনিত হয়।
—ও ইয়ার, এই লাও ঘুন শিখানা, তোমার ইয়ারনিরে দিও, আর কইও, হে আমারে তামাম জিন্দেগী যেন ইয়াদ করে।
ঝপাৎ।
এই যা। ফরমানউল্লার যাত্রা শুরু হলো নদীর অতল তলায়-এক মস্ত বড় দপ্তরে ।
ঘাঁটিতে ডে লাইটের জোরালো আলো। কী তীব্র তার আলো ঝর্ণাধারার মত ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। অর্ধেক গাঙ তার রোশনীতে ঝলমল । গ্রামোফোনের আওয়াজ শোনা যায়- সূর্য উঠার স্বপ্ন দেখে কে জাগে? দাস্ত বমিতে নাস্তনাবুদ আলেক ভূখা কুকুরের মত ঘাঁটির সাদা ধবধবে ঘরের পানে তাকায়। কে যায় নীল জামদানী পরে ঐ ঘরের সমুখ পথ দিয়ে? বেহেশতের হুরীর মত তার লাল গালের আভা তীব্র আলোর ধারায় চকচক করে।
এ জনমে নাই বা পেলো সে, আখেরে যদি এরূপ বাঁকা কোমরওয়ালী ছিপছিপে হুরী তার নসিবে লেখা থাকে। দু’জন সাহেব ত্বরিৎপদে বেরিয়ে এসে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। তার ক্ষীণ কটি দেশে একজনের কোমল হাতের বিদ্যুৎ স্পর্শ ।
—মেরী পিয়ারী দিলকা রোশনী !
তার গালে ঠোকা মেরে, সুন্দরী সিংহীর ভঙ্গিমায় ঘরে প্রবেশ করে । দুয়ার আস্তে আস্তে রুদ্ধ হয়। এবার বুঝি শুরু হবে বেহেতি খেলা । হায়রে নসিব! আলেকের ভূখা চোখ শাসন মানতে চায় না। অবিরত যুদ্ধ করে পরিশ্রান্ত আজর স্তব্ধ হয়ে পড়ে রয়।
—কি করবা মিঞা ভাই? আজর বুঝি চইল্যা গেলো?
রহিম কসিমের দিকে ছলছল চোখে তাকায় ।
—তা আর কি করবো, চল্ ফালাইয়া দেই ।
আজর ওদের চাচাতো ভাই। রহিম ও কসিম দুয়েরই বয়সে ছোট। আজরের বিয়োগ ব্যথা তীরের মত এসে কলিজায় বিঁধে, এবার দূরের পাল্লা চলে যেতে হবে এ জাহান্নামী জায়গা ছেড়ে। লাশে লাশে ছেয়ে ফেলেছে কংস নদী । পানি তোলবার ও ফাঁক নেই, এবার যেতেই হবে। দু’জনের একমাসের উপার্জন আট মণ করে ষোল মণ। দেশে নিলে কুড়ি টাকা দাম হলেও তিনশ’ কুড়ি টাকা। তার জন্য যদি একশত টাকাও সেলামী দিতে হয় তা-ও মন্দ কি?
রহিমউদ্দি একশ’ টাকা জামালপুরের ঘাঁটিতে দিয়ে হবে। ঘাঁটির দুয়ার খোলা পেলেই হয়। হাজার হাজার টাকা তাদের হাতে উড়ো খৈর মত এসে জমা হচ্ছে। এখন কি আর তার মত গরীব লোকের এ শতেক টাকার আশায় তারা বসে রয়েছে?
উসমান ও শমসের জোরসে দাঁড় টানে। যেরূপেই হউক, জামালপুরের এ আজরাইলের ঘাঁটি ছেড়ে দূরে বহুদূরে সরে পড়তে হবে । রহিমউদ্দির ছলছল আঁখি পানিতে ভরে যায়। ফেলে যেতে হলো চাচাতো ভাইটিকে। বাড়ি ফিরে গেলে যখন তার ছোট মেয়ে দইয়লী ছুটে এসে কঁচি হাত দুলিয়ে প্রশ্ন করবে :
—বাপজান কৈ, চাচাজি?
তখন কি জওয়াব সে দেবে? দেবে-একটা কিছু দিতেই হবে। আর ধান? তাতো দেবেই; তার অংশের ধানও কিছু দিয়ে দেবে। আহা-হা! বউটা বড় ভালো । না জানি কত যুগ কাঁদবে তার খসমের জন্য ।
রহিমউদ্দির উদ্ভ্রান্ত চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায় ।
—আরে মিঞা ভাই, আমাগো পারমিট আছে, ঘাঁটিতে টাহা না দিয়া চইলা গেলে আর কি হইবো?
সাহসী শমসের তাকে পরামর্শ দেয় ।
—দিমু না শালাদের এক পয়সাও; পারমিট নিতেও পয়সা, দেশে যাইতেও পয়সা-উঠতে গেলেও টাহা, বইতে গেলেও টাহা এক্কেবারেই জোকের মত শুষে নিতাছে-হু! দিমু না এক পয়সাও।
উমান শমসেরকে উত্তেজিত করে।
অভিজ্ঞ রহিমউদ্দি সায় দেয় না ।
—কি কাজ এই জাতের হাঙ্গামাতে যাইয়া? লিয়া যাউক একশ’ তাও ভালো। এত জনা লোক মইরা গেলো, কি হইবো টাহা পয়সা দিয়া? জানের তসদ্দুক মাল ।
অনেকগুলো নৌকা জড়ো হয়। রফিকউদ্দি, তরিকউদ্দিও উমানের কথায় সাড়া দেয় ।
—ক্যান দিমু টাহা? পারমিট লইতে আমরা টাহা দেই নাই? চলো পাড়ি দিয়া যাই – দেহি শালাগো কেমন জোর ।
সংক্রামক কলেরার মতই এ মনোভাবে সকল নৌকাই আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
তাদের এ এলাকা ছেড়ে দূরে-বহু দূরে চলে যেতে হবে।
কেঁং কেঁং-দাঁড় টানার এক ঘেয়ে শব্দ ।
—এই নৌকা, নড়ো না-এক পা-ও না ।
ঘাঁটির বারান্দায় বন্দুকধারী সিপাহর কঠোর কণ্ঠের নির্দেশ।
—যামু গিয়া, আটকাও দেহি। কেমন মরদের পোলা তোরা!
গুড়ম গুম!
রাত্রির আকাশ অকস্মাৎ বজ্রপাতে ফেটে চৌচির হয় । নৌকার আরোহীদের শোরগোল শোনা যায়!
—এই পইড়া গেল রহিমউদ্দি সরদার, ওই কেরামত হাজী- আরও চারজন।
—চালাও নৌকা, শালাকো হুকুম মানুম না ।
আহত ও নিহত সহযাত্রীদের ফেলে তারা চলে যায়- তড়াং করে ঘাঁটির দুয়ার আবার বন্ধ হয়। বাজখাঁই কণ্ঠের সঙ্গে পাতলা বেলোয়ারী আওয়াজের মিশ্রণে চমৎকার কোরাস জমে ওঠে।
০