বাঘের ডাক নয়, মেঘের ডাকে আশ্রয়প্রার্থীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে । মেঘে মেঘে অবিরাম সংঘর্ষে কড় কড় শব্দে আসমান ফেটে চৌচির হয় । মুহূর্তের মধ্যে অজস্র ধারায় মেঘের ঢল দুনিয়ার বুকে নামবার আশঙ্কা । তখন বাইরে স্রোতের সঙ্গে ঘরের ভেতরও বয়ে চলবে বন্যার স্রোত। তিল ধারণেরও স্থান অবশিষ্ট রইবে না। শয্যাশায়ী স্ত্রী-পুরুষ সকলেই ঝটিতি উঠে বসে । কাচ্চা-বাচ্চা সামলায়। কাঁথা গায়ে দিয়ে গা মুড়িসুড়ি দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়। আত্ত ছেলে-মেয়েদের কল গুঞ্জন শোনা যায়। বুড়োরা বিরক্ত হয়ে নিজেদের নসিবকে দোষ দেয়। আর কেউ কেউ এবারকার অতিবৃষ্টির অত্যাচারকে গালিগালাজ করে ।
চুছুন্দর-মুখো বেঙ্গাই শেখ খুব ঘুমের কাতর, অবিরাম বর্ষণের মাঝে তার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না ।
“কসিরা বিরক্ত হয়ে অনুযোগের ভাষায় বলে, বুড়ার আর ঘুম ভাঙতো না, দুনয়া গারত অইলেও এই মুরদা আর জাগতো না।’
পরিহাস-রসিক আকল তার সমালাচনায় যোগ দেয় ৷
: না-না বুড়া মানুষ ঠাণ্ডা পাইয়া আরামে ঘুমাইতাছে। তুমি খামকা ডাকিয়া তুলিয়ো না নানী। ঘুমাউক, বড় আরামে ঘুমাইতাছে ।
কসিরার এ মস্করা মোটেই ভাল লাগে না, আকলের সান্ত্বনাতে সে স্বস্তি খুঁজে পায় না ।
: অতো যদি ঘুমাইবার লাগি পাগল এক্কবারেই ঘুমাইয়া পড়ুক না। কিছু ঘুমায় আর ব্যারামে ভুগে আর ঠ্যালা সামলাই আমি। আমি তো আর পারতাম নায় । এইবার বুড়ার তাপ হইলে আমি ধারোও যাইতাম না। একই ঘরের মাঝে দশটি পরিবার। কারো বাড়িতেই ঘর নেই। সকলেই নিরুপায় হয়ে ফরিদ মোড়লের বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র-পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের একমাত্র বিত্ত হাস-মুরগিগুলোও সঙ্গে আনতে ভোলেনি। মানুষের সাড়া শব্দে হাস মুরগিগুলোও ডাকাডাকি শুরু করে দেয় । বাইরে প্রকৃতির তাণ্ডব-নৃত্য আর অবিশ্রান্ত বর্ষণের মাঝেও শেয়াল ও বাঘডাসার আনাগোনার বিরাম নেই।
কখন কার মালের উপর হামলা চড়বে সেই ভয়ে সকলেই ভীত।
মকবুলের পিতৃমাতৃহীনা ষোড়শী মেয়ে শবিজানের কোল ঘেঁষে, আবরুর বাড়ন্ত জোয়ান ছেলে ফখরু, গুড়ি মেরে বসে পড়ে।
শবিজানের ফুফু তাজুর মা কাঁসার আওয়াজের মত তীক্ষ্ম স্বরে বলে— রে ফখরু, তোর কোনু লজ্জা-শরম নাই? আমার জোয়ান ভাইঝির এক্কইবারে কোলের মাঝে বইয়া রইলি! আমার কোনু মান-ইজ্জত নাই? সপ্রতিভ ফখরুর মুখে মৃদু হাসি দেখা দেয় ।
: কোয়াই যামু দাদি? আর লড়বারও ফুরসত নাই, লড়নে ঔ তো তামাম ঘর লড়িয়া উঠবো ।
রাশভারী হেকিম আলী স্বভাবতঃ স্বল্পভাষী । তাজুর মার তিরস্কারে বিরক্ত হয়ে বলে-গরীবের নি আর মান-ইজ্জত! যে ভায় বইয়া আছো, বইয়া থাকো । খামকা চিল্লাচিল্লি কইরা কিতা অইবো ।
তাজুর মা গরম বালির মত ছিটকে পড়ে।
: গরীব অইলে বুঝি মান ইজ্জত থাকে না? ধনী অইলেও খালি মান- ইজ্জত তোর বেটীর ধারো ইভায় গেলে কিতা করতে ক’চাইরে হেকিম? হোমিও কম যায় না ।
: অতো শান-মান থাকলে আর পরোর ঘরো আইতায় না। অতো বেশী কথা কইয়ো না দাদি ।
তাজুর মা নিশ্চয়ই দাঁতভাঙ্গা উত্তর দিতো। ছমিরউদ্দিন বাজখাঁই কণ্ঠের আওয়াজে তা বন্ধ হয় ।
: অতো চিল্লাচিল্লি কইরা মরিও না বেকুবের দল। হেষে মোড়ল বার কইরা দিবো হকলরে। কাইল কিতা কইছে ভুলি যাইও না।
মোড়লের নাম শুনে সকলেই শান্ত হয়। তবুও বসবার একটুখানি ঠাঁই তাদের ভাগ্যে জুটেছে। বৃষ্টিতে না হয় ভিজলোই তারা, রোদের তাত থেকে আত্মরক্ষা করা অনায়াসেই তাদের চলে। বের করে দিলে এ অঞ্চলে আর কোথায়ও মাথা গুঁজবার ঠাঁই পাওয়া যাবে না। তখন কোথায় দাঁড়াবে তারা এতগুলো মানুষ?
ভিজতে ভিজতে অতিষ্ঠ হয়ে মুরগিগুলো ছুটাছুটি শুরু করে দেয়। তাদের লাফালাফিতে সঙ্গে সঙ্গে বাসিন্দাদের মাঝেও চঞ্চলতা প্রকাশ পায়।
রফিনার বড় মুরগা বেড়ার ফাঁকে কিসের আকর্ষণে বেরিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রফিনা দরজা খুলে পাগলের মত ধাওয়া করে ।
: কিতা করলে-কিতা করলে রফিনা? তুই আমার দুধের বাচ্চারে মাড়াইয়া গেলে?
বলে উগ্রচণ্ডী কথার মা তাকে তাড়া করে ।
বের হয়েই এক বিকট আর্তনাদ করে মুরগাটি অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। রফিনার বুঝতে দেরী হয় না তার যাত্রা শুরু হয়েছে শেয়ালের সর্বগ্রাসী পেটের আধারে ।
শেয়ালের পিছনে মূর্তিমান আজরাইলের মত রফিনা তীরের বেগে ছুটে চলে। কথার মা তার নাগাল পায় না। দাওয়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণা রফিনার উদ্দেশ্যে কথার শর নিক্ষেপ করে। মোড়লের আসন্ন নির্দেশের ভয়ে ভীত আশ্রয়প্রার্থীদের অস্ফুট কলবর শোনা যায়। : আরে আল্লা, এই দুই দজ্জাল বেটী সব্বনাশ কইরা ফালাইলো। অনেও মোড়ল আইয়া বার কইরা দিব রফিনার চেঁচা-মেচিতে হাস-মুরুগগুলো কোরাস জমিয়ে তোলে । তাদের ছুটাছুটি, ঝাপটাঝাপটি শুরু হয় । তাদের আগলাতে যেয়ে মালিকদের মাঝে বাক-বিতণ্ডার অন্ত নেই।
: আমার হাঁস এই টীন, তুই আমার হাসটীন তরে খেদাই দিছস? মিঠাইর মার তিরস্কারে মটাই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে
: তোর খালি হক্কল কথাত ঐ দোষাদোষী। তুই অতো বড় মানুষী দেখাইছ না মিঠাইর মা।
এতোক্ষণে বুঝি বেঙ্গাই শেখের ঘুম ভাঙে। সোজা হয়ে বসে কামানের মত গর্জন করে ।
: এই দুই বেটীরে বাইর কইরা দেও— না ঘুমান যায় না বওয়া যায়।
এবার চিল্লাচিল্লির মাঝে । ঝুম ঝুম করে অবিরাম বৃষ্টিধারা ঝরে পড়ে। এবার ঘর শুদ্ধ ভেঙে পড়তে পারে। বাইরে রফিনার বিজয় উল্লাসে রাত্রির আকাশে প্রতিধ্বনিত হয় ।
: কার পাল্লায় পড়ছিলায় চিনো না বাবাজি, মুখ থাকি কাইড়া লইয়া আইছি-বাবাজি, হকলের সাথে জুলুমবাজি চলে না।
মরা মুরগার লাশ মেঝেয় রেখে পরিশ্রান্ত রফিনা হাপায়। দুলহার মার ছোট ছেলে আকাইর রসনা লালাসিক্ত হয়ে পড়ে-
: মাইগো, তিন দিন ধরি কোন তা-ওই খাইছ না। রফিনা মইর ঠাই চাইয়া এক জরা গোস্ত লও নানে ।
দুলহার মার উত্তর পাওয়ার আগেই রফিনার কান ফাটা সুর কলজেয় এসে বিঁধে ।
: হু হিয়ালর মুখ থাকি কাইড়্যা লইয়া আইছি তোর লাগিই বুঝি, আমার কাচ্চা-বাচ্চা নাই? তোর লাকান লালচিয়া পোয়া দুয়ার মাঝেও নাই । দুলহার মার মুখের হাসি তীব্র প্রতিবাদের রূপ নিয়ে দেখা দেয়।
: মনে রাখিছ লো, কাইল মালাই গাঙে আমার পোয়া পুটিমাছ মাইরা আনলে দেখমু মাছ নি চাছ।
: আচ্ছা খু-উ-ব মনে রাখমু। অতো দেমাক দেখাইছ না, বেঙ্গাই ধমক দেয়।
: অতো চিল্লাইস না- ঐ হুন মড়লর কাশি- অনে-ই আইয়া পড়বো-
শবিজানের টানা টানা চোখে আসন্ন সংকটের ভীতি ফুটে উঠে। আসঙ্গলিপ্সু ফখরু তার হাতে একটু চাপ দেয়। পুরুষের প্রথম পরশে তার নারীদেহের কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিদ্যুতের স্ফুরণ হয়। অনাস্বাদিত পুলকে তার শরীরের লোমগুলো খাড়া হয়, কিন্তু সে মধুর সংবেদন ক্ষণস্থায়ী। ফুফুর জ্বালাময়ী দৃষ্টির ভয়ে সে নিজেকে আলগা করে নেয় ।
আকাশ ফর্সা হয়েছে। বৃষ্টিধারা থেমে গেছে। তবুও তার বর্ষণের কণাগুলো টুপটুপ করে ঘরের ভেতর ঝড়ে পড়ছে। মোড়লের কোন সাড়া নেই। স্তব্ধ আশ্রয়প্রার্থীরা তার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করে । তার কি আদেশ কখন কার মাথায় ভেঙ্গে পড়বে কে জানে?
০