চার : মৃত্যুর মুখোমুখি
বুড্ডা চোখ বন্ধ করতেই দেখল যে সে একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে প’ড়ে গেল। সে যেই তার মধ্যে পড়ল, অমনি গর্তটির মুখ বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সে বিন্দুমাত্র ভয় পেল না, কারণ এ গুরুর ইচ্ছা এবং আদেশ। আল্লাহর ইচ্ছা না হলে গুরুজী নিশ্চয়ই এরূপ ইচ্ছা করতেন না। কিন্তু সে কোনো পথ পাচ্ছিল না। এদিকে কোনো আলোও নেই। সে আরবিতে তেলাওয়াত করল :
শপথ রাতের, যখন তা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে । শপথ দিনের, যখন তা আবির্ভূত হয়।…
আমার কর্তব্য তো কেবল পথনির্দেশ করা। আমিই তো পরলোক ও ইহলোকের মালিক। (সূরা লাইল: ১,২,১২,১৩)
ফলত দুঃখের সাথেই সুখ আছে।
নিশ্চয়ই দুঃখের সাথেই আছে সুখ।
(সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬)
আল্লাহ্ আসমান ও জমিনের আলো, তাঁর আলোর উপমা তাকের মধ্যে এক প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাঁচের আবরণের মধ্যে অবস্থিত, কাঁচের আররণটি উজ্জ্বল নক্ষত্র-সদৃশ,এটি প্রজ্জ্বলিত হয় পবিত্র জয়তুন গাছের (তেল থেকে), যা প্রাচ্যেরও নয়, প্রতীচ্যেরও নয়, (তাতে) অগ্নিসংযোগ না করলেও মনে হয় তার তেল উজ্জ্বল আলো দিচ্ছে: আলোর ওপর আলো— আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তাঁর আলোর দিকে পথ নির্দেশ করেন। (সূরা নূর: ৩৫)
সে চোখ বন্ধ ক’রে এসব পড়ছিল। এমন সময়ে সে একটা পাথুরে কিছু স’রে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। সে সাগ্রহে তাকিয়ে দেখল যে সে যাতে ব’সে আছে তা আসলে কোনো গর্ত নয়, একটা সুড়ঙ্গ পথ। পথটা সোজা নয়, অথচ ওদিক থেকে তার মধ্য দিয়ে একটা আলো প্রবাহিত হচ্ছে, যদিও সে এতদিন জেনে এসেছে যে আলো সরলরেখায় চলে। সে সেই আলোয় পথ চলতে লাগল। সে সেই আলোর রহস্যময় চরিত্র দেখে বিস্মিত হলো। সে যত পথ এগোচ্ছে, তত পেছনের দিকে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, আলো থাকছে শুধু সামনে। আলোটা তার সাথেই চলছে ব’লে তার মনে হলো। সে ভাবল সম্ভবত এ হলো হেদায়েতের আলো। পথ দেখার আলো। এ আলো পেলে কেউ আর পেছনে যেতে পারে না। কারণ তার পেছনটা তওবার প্লাবনে বিলীন হয়ে গেছে। এ আলো সরলরেখার ওপর নির্ভরশীল নয়, কারণ তা চ’লে গেছে পথ বরাবর। অবশ্য এ আলো বাঁকা পথকেও সোজা ক’রে দেয়। সে পড়তে লাগল :
আল্লাহ্ ইসলামের জন্য যার বুক খুলে দিয়েছেন, এবং সে তার প্রতিপালকের আলোর ওপরে আছে, (সে কি তার মতো যে এরূপ নয়?) দুর্ভোগ তাদের যাদের অন্তর আল্লাহ্ স্মরণে বিমুখ। ওরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে। আল্লাহ্ উত্তম বাণী সম্বলিত কেতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পুনঃপুন আবৃত্তি করা হয়। এতে যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের গাত্র রোমাঞ্চিত হয়, অতঃপর তাদের দেহ-মন প্রশান্ত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে; এটিই আল্লাহর পথ নির্দেশ তিনি যাকে ইচ্ছা তার দ্বারা পথ দেখান। আল্লাহ্ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই। (সূরা যুমার: ২২-২৩)
সে নিজ মনে বলতে লাগল—‘প্ৰভু গো! তোমার আলো বাঁকা পথকেও সোজা ক’রে দেয়।’ এই কথাটা বলতে বলতেই সে এমন একটা জায়গায় এসে থেমে গেল যেখান থেকে সুড়ঙ্গটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ডান দিকের পথটি কঠিন—এবড়ো থেবড়ো, বামদিকের পথটি সহজ। সে মুহূর্তের জন্য চিন্তা করল কোন পথে যাবে । সহসা তার মনে পড়ল কোরআনে কারীমের আয়াত :
নিশ্চয়ই আমি মানুষকে ক্লেশকর শ্রমনির্ভর ক’রে সৃষ্টি করেছি।…
এবং আমি কি তাকে দু’টি পথ দেখাইনি?
কিন্তু সে তো গিরি সংকটে (কষ্টসাধ্য পথে) প্রবেশ করল না । (সূরা বালাদ: ৪, ১০, ১১)
আল্লাহ্ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি মন সৃষ্টি করেননি। (৩৩ : ৩৪)
সে ভাবল, ‘পথ দুটো অথচ মন একটা’—সুতরাং একটাকেই বেছে নিতে হবে। তাই সে বিসমিল্লাহ ব’লে ডানদিকের কঠিন পথটি বেছে নিল। আর অমনি কে যেন কোথায় ব’লে উঠল— মারহাবা!
সে এই পথে বেশি দ্রুত এগোতে পারছিল না। তার সারা শরীর ব্যাথায় জর্জরিত হয়ে গেছে। পায়ের গোড়ালি ও আঙ্গুল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। নিঃশ্বাসে ক্লান্তি এসে গেছে । এমন সময়ে হঠাৎ ক’রে তার পথপ্রদর্শক আলোটি উধাও হয়ে গেল। সে গভীর ঘুটঘুটে ভূতুড়ে অন্ধকারের মধ্যে ডুবে গেল। সে অন্ধকার এত বেশি গাঢ় এবং ভারী যে সে যেন তার ত্বকের ওপর কালো একটি চাদরের স্তর অনুভব করতে লাগল। সে আর নিজেকেও দেখতে পাচ্ছে না। সে অত্যন্ত অবাক হলো। ভাবল—অন্ধকারেরও যে এত ওজন, এত গাম্ভীর্য, তা তো আগে কখনও বুঝিনি। কিছুক্ষণ সবিস্ময়ে ব’সে থেকে আবারও অনুভবে পথ চলতে শুরু করল । কিন্তু এভাবে পথ চলতে হলে কখন সে পৌঁছাবে গন্তব্যে?
হঠাৎ তার মনে হলো—আমার গন্তব্য কী? কোথায় যাচ্ছি আমি? আমার লক্ষ্য কি সুড়ঙ্গ পার হওয়া নাকি একে জয় করা? সে প্রথম দিকে কিছুই স্মরণ করতে পারছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল যে তাকে গুরুজীই এখানে পাঠিয়েছেন। সুতরাং তিনি কেন পাঠিয়েছেন তা তার জানার কোনো দরকার নেই ।
হঠাৎ সে পায়ের তলায় অল্প পানি অনুভব করল। ভিজে মাটি। টুকরো পাথর । শরীরে ফুটে যেতে পারে এমন সব টুকরো জিনিস। তার পা ফেলতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। এদিকে সামনে যে বেশি পানি রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছিল কিছু যেন তাতে নড়ছিল সেই শব্দ দ্বারা। তার গা ছম ছম করে উঠল। সে ছোটবেলা থেকে অন্ধকারের মধ্যে পানিকে খুব ভয় করে। কিন্তু তার মনে যত ভয় আসতে লাগল ততই সে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে লাগল। সহসা কোত্থেকে আওয়াজ এল—‘সামনে সাপ!’
সে বলল, ‘গিলে খাব।’
‘পোকা-মাকড়।’
‘কবর দেব।’
‘হঠাৎ পানি । অথই গভীর । ’
‘শুকিয়ে ফেলব। অনেক তৃষ্ণা।’
‘সামনে মৃত্যু।’
‘পেছনেও।’
‘চার পাশেই!’
বুড্ডা হঠাৎ থেমে গেল। সে যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরে পেল। সে বুঝতে পারল যে সে এতক্ষণ যা বলেছে তা আবেগের উচ্ছ্বাসে বলেছে। এখন সে স্বাভাবিক। স্বাভাবিক মানুষ মৃত্যুকে বড় বেশি ভয় পায়। সে খানিকটা হতাশ হয়ে পড়ল । তার চিন্তা যেন কোনো একটি বিন্দুতে এসে থেমে গেছে। তা না পারছে এগোতে, না পারছে পিছাতে। হায় সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গের চলা কেবল সামনের দিকেই সম্ভব। পেছোবার উপায় নেই। কিন্তু সামনেও যদি এগোনো না যায়, তাহলে তাকে কি সুড়ঙ্গ বলা যায়? সে যেই একথা ভাবল, অমনি অদৃশ্য থেকে শব্দ ভেসে এল—‘তাকে বলা যায় কবর।’
বুড্ডা ধপাস ক’রে কাদা পানির মধ্যে ব’সে পড়ল। তার সারা শরীর অসাড় হয়ে গেছে। বেশী ভয় পেলে শরীরে কাঁপার শক্তিও থাকে না। কাঁপতে পারলেও কিছুটা শক্তি সৃষ্টি হয়। যেমন প্রচণ্ড ঠান্ডায় আমরা কাঁপতে কাঁপতেই শরীরে তাপ সৃষ্টি করি।
অদৃশ্য থেকে বাণী এল— ‘এগিয়ে যাও।’
আওয়াজটা যেন সুড়ঙ্গ ফাটিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। এই ধ্বনির কম্পনে সে যেমন ভয় পেল, তেমনি তা থেকে কিছু শক্তিও পেল। সে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল আল্লাহকে ভয় পাবার উপকারিতা কী। তার চিন্তার জট এখন কিছুটা খুলেছে—তবে পেছনের দিকে, সামনের দিকে নয়। সে শুধু পেছনের কথা চিন্তা করতে পারল, সামনের চিন্তাটা যেন পানির ওপরে তেল মাথায় আসতে চায় না।
‘এগিয়ে যাও!’
সে এক পা পিছোলো।
‘এগিয়ে যাও। নিশ্চিত মৃত্যু ছাড়া তোমার দ্বিধা কাটবে না।’
সে আরেক পা পিছোলো।
‘মৃত্যু সকল সন্দেহের অতীত। মনের ব্যাধির জন্য একমাত্র ওষুধ।’
সে আবারও প’ড়ে গেল ।
বাণী এলো— ‘তুমি কঠিনকে এত সহজভাবে নিচ্ছ কেন?’
একথায় বুড্ডার মনে প্রাণ সঞ্চার হলো। সে তার ভুলটা বুঝতে পারল। সে বুঝতে পারল যে মৃত্যু কোনো সহজ বিষয় নয়। সুতরাং তাকে সহজভাবে নেয়ার দরকারও নেই। কঠিনকে কঠিনভাবে নিলেই তা সামাল দেয়া সম্ভব। এই পথটা যদি কঠিন না হতো, তাহলে সে এত সফলভাবে তাতে এগোতে পারত না। কাঠিন্যই তার যোগ্যতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তার মনে পড়ল তার ছোটবেলার একটি ঘটনা। সে একদিন তার বাবার সাথে বর্ষাকালে গ্রামের হাট থেকে বাজার ক’রে ফিরছিল । সে হাঁটু-প্রমাণ কাদায় পথ চলতে পারছিল না। তার বেহাল অবস্থা দেখে তার বাবা তাকে কাছে ডেকে তাঁর মাথার বোঝাটাকে ছেলের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে বললেন—‘এবার হাঁট, আর প’ড়ে যাবার ভয় নেই।’ সে সত্যি-সত্যি আর পড়ল না। পরে তার বাবা তাকে বুঝিয়েছিলেন যে, মানুষ যখন দায়িত্ব পায় তখন তার যোগ্যতাও বেড়ে যায়। তার মনে পড়ল নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত জন স্টেইনবেকের The Flight গল্পের সেই বাণীটি A boy gets to be a man when a man is needed. যখন পুরুষের দরকার পড়ে, তখন একটা বালকও পুরুষের মতো আচরণ করে। সুতরাং সে আবারও সামনে এগোতে শুরু করল । কিন্তু আবারও হুশিয়ারি— ‘মৃত্যু!’
সে শিশুর মতো টলতে টলতে আরেক পা এগোল। আবারও শুনতে পেল— ‘এখানে সামান্য ব্যবধানেই রয়েছে মৃত্যু। আরেক বার ভেবে দেখ।’
সে একটা বইতে পড়েছিল যে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাজের প্রেরণা এবং যোগ্যতা বাড়ানোর জন্য একটা তত্ত্ব আছে যাকে বলে Goal Setting Theory of Motivation বা প্রেরণার (প্রেষণার) লক্ষ্য-নির্ধারণ তত্ত্ব। এই তত্ত্বটি অনুসারে, কর্মীরা কাজের যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে ব’লে মনে করা হয়, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিৎ তার চেয়ে একটু উঁচুতে। তাতে কর্মীদের উদ্যম ও প্রেরণা বাড়বে, যোগ্যতাও বাড়বে। একথা কোরআনেও আছে—আল্লাহ মানুষকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চালিত করেন তার যোগ্যতা বাড়ানোর জন্য (দ্রঃ ধ্যানের শক্তি ও নবজীবন), যদিও অধিকাংশ মানুষ তা পছন্দ না ক’রে জীবনটাকে সহজে পেতে চায়। অথচ তারা বুঝতে পারে না যে জীবনটাকে পাওয়া ব’লে কিছু নেই, তাকে গ’ড়ে নিতে হয়। তার আরো মনে পড়ল যে সূরা লাইল-এ আল্লাহ্ বলেছেন যে যারা ভালো কাজ করতে চায় এবং করে, আল্লাহ্ তাদের জন্য ভালোকাজ করাকে সহজ ক’রে দেবেন। অর্থাৎ তার ভালোকাজের যোগ্যতা বাড়তে থাকবে । সে দাঁড়িয়ে গেল। পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘এখানে কি শুধু মৃত্যু আছে? আল্লাহ্ কি নেই এখানে?’
কোনো সাড়া এলো না ।
সে আবারও প্রশ্ন করল— ‘এখানে কি আল্লাহ্ নেই?’
নীরবতা।
খানিক পর গুরুজীর কণ্ঠ ভেসে এল— ‘চিন্তা কম ক’রে কথা বলবে।’
সে বুঝতে পারল গুরুজী তার দিকে নজর রাখছেন। তৎক্ষণাৎ তার মুখ থেকে শক্তিধারার মতো বাণী বের হয়ে এল :
শপথ গনগনে আগুনের
যখন তা আলোর সান্নিধ্যে ঘটায়
তীব্র তাপের সমারোহ
এবং ক্ষুধার, যখন তা আত্মমুখী হয়ে
নিজেকে পোড়ায়
এবং সূর্যের, যখন তা অনায়াসে গিলে খায়
উপস্থিত গোলার্ধের সবটুকু রাত :
আমার প্রতিপালক তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যেও বর্তমান
তাঁর অনুপস্থিতিও তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য
এবং শপথ তাঁর আমি যাঁকে পাইনি
তিনি তাঁর গোলামের না-পাওয়ার মধ্যেও বিদ্যমান
পূর্ণগর্ভা জননীর শপথ,
যার প্রসব-বেদনার মধ্যেই রয়েছে কাঙ্খিত সন্তানের প্রতিশ্রুতি
এবং জঠরস্থ সন্তানের—
যার জন্মের প্রথম শর্ত প্রসব বেদনা
প্রতিটি দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই আল্লাহ্ আছেন
তিনি আছেন তাঁর পথে চলার মুহুর্মুহু রক্তপাতের
মধ্যেও এবং শপথ নিঃশ্বাসের, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে আগামী প্রশ্বাস
আল্লাহ্ রয়েছেন তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যেও
পুরোপুরি অভিন্ন মাত্রায়
প্রশংসা তাঁর, থাকা-না-থাকা উভয়ই যাঁর অস্তিত্বেও
এপিঠ-ওপিঠ।
তার উচ্চারণ শেষ হতে না হতেই গোটা সুড়ঙ্গ আলোকিত হয়ে উঠল। সে সামনে তাকিয়ে দেখল যে তার সুড়ঙ্গ এখানেই শেষ। সামনেই রয়েছে প্রকাণ্ড এক অন্ধকারের গর্ত—ঘুটঘুঁটে কালো শূন্যতার মধ্যে একটি গর্ত। তার দিকে তাকালে মনে হয় যেন দৃষ্টি হারিয়ে গেল, চিন্তা স্তব্ধ হয়ে এল, চারদিক থেকে গ্রাস করল এক ভয়াল একাকিত্ব। তার বিশালতা এত যে তা যেন গোটা মহাবিশ্বকে গিলে খেতে পারে। তার মধ্যে তীব্র অন্ধকার যেন গাঢ় ধোঁয়ার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে ছুটে আসছে এক ভূতুড়ে আকর্ষণী শক্তি, নিঃস্বতার আর্তচিৎকার, বীভৎস দৃশ্যাবলী, এবং ক্ষুধার্তের মতো তারা এগিয়ে এসে আবারও সেই অসীম গহবরের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হতে লাগল যে সে যদি আর এক পা এগোয় তাহলে অন্ধকারের সুড়ঙ্গটি তাকে তীব্র আকর্ষণে টেনে নিয়ে যাবে—তাকে টানতে থাকবে অনন্তকাল ধ’রে এবং সে সেই গভীর গর্তের মধ্যে প’ড়ে যাবে—এবং অসহায়ভাবে শুধু পড়তেই থাকবে। সে ঠক ঠক ক’রে কাঁপতে লাগল। গর্ত থেকে অন্ধকারের জিহবাগুলি বের হয়ে এসে তাকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে লাগল। সে দেখতে পেল যে গর্তটির গভীরে লেখা আছে একটি শব্দ—মৃত্যু! এই লেখাটি থেকেই সৃষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন রূপ এবং উদ্ভট আকৃতি । বুড্ডা বুঝতে পারল সে কিসের সামনে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ তার চিন্তা অনুভূতি সব অতীতমুখী হয়ে ছুটতে লাগল। সে তার জীবনের সমুদয় পাপকে সামনে দেখতে পেল। চোখ দুটি বন্ধ করার কোনো উপায় তার ছিল না। সেগুলি যেন আপনা থেকেই বড় হয়ে আসতে লাগল । এখন আর চোখ তার কথামতো চলছে না, তার সাহায্যেরও এখন দরকার চোখের নেই; তারা যেন নিজেরাই দৃশ্যসচেতন । বুড্ডা জড়িতশ্বাসে তওবা পড়ে নিল। তারপর কালিমা তায়্যিবা, তারপর কালিমা শাহাদাত । অন্ধকূপ থেকে হঠাৎ এক ঝলক শীতল হাওয়া তার দিকে শ্বাস ফেলল । তার শরীর অকেজো হয়ে আসতে লাগল। হৃৎকম্প ধীর হতে লাগল। নিঃশ্বাসে এখন শক্তি লাগছে বেশি—ফুসফুস যেন তার নিজের দখলে নেই। সে প্রাণপণ প্রচেষ্টায় বলল – মাত্র পাঁচ মিনিট! প্লিজ! একটা প্রার্থনা করা দরকার।
কিন্তু আরো শীতল এবং গাঢ় ঘুটঘুটে একটা জিহবা তার দিকে নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে এল। সে আপ্রাণ মিনতিতে বলল—এক মিনিট তাহলে। এখনও মনটাকে গোছগাছ ক’রে নিতে পারিনি ।
জিহবাটা তার নিঃশ্বাস ধ’রে টানতে শুরু করল। সে কোনো মতে ‘এক সেকেন্ড!!’ ব’লে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।