proggapath, progga, bangla literature, bangla kobita, bangla golpo, babgla story, romantic golpo, প্রজ্ঞাপাঠ, বাংলা সাহিত্য, কবিতা, বাংলা কবিতা, প্রজ্ঞা, গল্প, বাংলা গল্প, রহস্য গল্প, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, শিল্প-সাহিত্য, নাটক, চিঠি, patropanyas, poem, Story, golpo, bangla poem, bangla Story, Rahasya golpo, Rommo Rocona, Articles, Prabandha, Novel, Upanyas, Drama, Natok, Letter, Cithi, Art and literature, silpo-sahityo, হযরত আলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চিঠি, Hazrat Alir ekti guruttopurno proshasonik cithi

হযরত আলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চিঠি

০ মন্তব্য দর্শক

কুফা

৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ/৩৭ হিজরী

একজন আল্লাহ্ বান্দা

আলী ইবনে আবূ তালিবের পক্ষ হতে

মিসরের ভাবী গভর্নর

মালিক ইবনে হারিস আশতারের প্রতি

মালিক,

আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ প্রদান করছি, জীবনের সর্ববিধ কাজে আল্লাহ্ এবং তাঁর প্রদত্ত ব্যবস্থাকে সর্বোপরি স্থান প্রদান করবে। তাঁর স্মরণ ও ইবাদতকে অগ্রাধিকার দান করো। কুরআনের নির্দেশ ও নবীর শিক্ষাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অনুসরণ করবে। এ সমস্ত নির্দেশ প্রতিপালনের উপরই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নির্ভরশীল, যারা এসব অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে চিরকালীন অভিশাপ, আল্লাহ্র নির্দেশ পালনে অপারগতার পরিণতি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনেই চরম ব্যর্থতা হয়ে দেখা দেবে। সুতরাং তোমাকে অবশ্যই আল্লাহর প্রদত্ত মূলনীতিগুলোকে মেনে চলতে হবে, আল্লাহর উদ্দেশ্যকে সমর্থন দিতে হবে এবং তাঁর নির্দেশমালাকে সম্মান করতে হবে, কেবল এভাবেই তুমি আল্লাহর সাহায্য, অনুগ্রহ ও রহমতের যোগ্য হতে পার।

আত্মনিয়ন্ত্রণ

আমি তোমাকে আদেশ করছি মালিক, তোমার মনমগজ, হাত ও কণ্ঠ এবং তোমার সমগ্র সত্তা দিয়ে আল্লাহ্কে— তাঁর উদ্দেশ্য ও সৃষ্টিকে সাহায্য করতে । আল্লাহ্ তোমাদের আদেশ করেছেন তোমাদের কামনা ও বাসনাকে নিয়ন্ত্রিত করতে, তোমাদের ‘আত্ম’ ও অহংবোধের রশি টেনে ধরতে, বিশেষ করে যখন তোমাদের কামনার পাগলা ঘোড়া তোমাদের শঠতা ও পাপের দিকে তাড়িয়ে নিতে চায়। তোমাদের ‘আত্মবোধ’ ও তার আকাঙ্ক্ষা তোমাদের প্রতিনিয়ত অধঃপতন ও অবমাননার দিকে প্ররোচিত, উৎসাহিত ও জোর করে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়।

সতর্ক জনগণ

মালিক, আমি তোমাকে এমন একটা দেশের প্রশাসক করে পাঠাচ্ছি, যা অতীতে নীতিহীন ও ন্যায়পরায়ণ, নিপীড়ক ও প্রজাহিতৈষী, নিষ্ঠুর ও হৃদয়বান, অত্যাচারী ও দয়ার্দ্র—এ ধরনের সব সরকারই প্রত্যক্ষ করেছে।

জনগণ পূর্ববর্তী সব শাসন ব্যবস্থাকে যেভাবে নিরিখ করেছে, ঠিক একই রকম সূক্ষ্মভাবে তারা তোমার প্রশাসনকেও বিচার করবে। তুমি পূর্ববর্তী শাসকদের সমালোচনা করছ, যদি তুমি আত্মচেতন না হও তবে তুমি তাদের সম্পর্কে যা বলছ তারাও তোমার সম্পর্কে একই কথা বলবে।

একজন সৎ ও ভালো মানুষের পরিচয় পাওয়া তার সম্পর্কে ভালো কথা যা বলা হয় এবং অপরের কাছ থেকে যে প্রশংসাগুলো আল্লাহ্ তার জন্য নসীব করেন। মনে রেখো, ক্ষমতাসীন লোকদের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার তাদের বংশধরদের দ্বারা তার কৃতকর্মের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

সৎকর্ম

অতএব তুমি তোমার মনকে মহৎ চিন্তা, সদুদ্দেশ্য, সদিচ্ছা ও সৎকর্মের ঝর্ণাধারার উৎসমূল করে তোল । সৎকাজের হিসেব বাড়িয়ে তোলাই যেন হয় সবচেয়ে বড় চিন্তা । এতে তুমি সফল হতে পারো, তোমার কামনা-বাসনাকে লাগামছাড়া হতে না দিয়ে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থেকে।

জেনে রেখো, নিজের প্রতি সুবিচার করবার এবং ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকবার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং অসৎ বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করা।

মালিক, তোমাকে অবশ্যই পছন্দ এবং অপছন্দের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং তোমার মনে জনগণের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহৃদয়তা লালন করতে হবে। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত তোমার সাফল্যই নির্ভর করছে তাদেরকে নির্যাতন ও নিষ্পেষণের উপর—এমনভাবে তুমি তাদের সাথে ব্যবহার করবে না।

অমুসলিমদের প্রতি আচরণ

মনে রাখবে মালিক, জনগণের মধ্যে দু’ধরনের লোক রয়েছে—এক হচ্ছে তোমার ঈমানী ভাই এবং অন্যেরা হচ্ছে অন্য ধর্মে বিশ্বাসী—কিন্তু তারা তোমারই মত মানুষ । উভয় প্রকার মানুষই সাধারণ মানবীয় অক্ষমতা ও দুর্বলতার শিকার।

জেনে কিংবা না জেনে তারা অপরাধ করে থাকে এবং তাদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন হয়ে তারা পাপ কাজে লিপ্ত হয় ।

তোমার প্রতি আল্লাহর যে রকম দয়া ও সহানুভূতির আশা কর তাদের প্রতিও তুমি তেমন দয়ার্দ্র ও সহানুভূতিশীল হও।

তোমাকে তাদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। তোমার ভুলে গেলে চলবে না যে, তোমার উপরে তোমার খলীফা রয়েছেন, আর তোমার খলীফার উপর রয়েছেন আল্লাহ।

আল্লাহ্ তোমাকে গভর্নর বানিয়েছেন, তোমার উপর জনগণের দেখাশোনার ভার দিয়েছেন এবং তিনি তাদের মাধ্যমে তোমাকে পরীক্ষা করতে চান।

নিজেকে কখনো এমন পর্যায়ে উন্নীত করার কথা ভেবো না, যাতে করে আল্লাহর সাথে দ্বন্দ্বের—তথা তোমার আত্মাকে ধ্বংস করবার আশংকা রয়েছে। তাঁর শাস্তি থেকে রেহাই পাবার শক্তি তোমাদের নেই আর তাঁর ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ ও সহানুভূতি ছাড়া তোমার চলা সম্ভব নয়।

সহমর্মিতা ও অনুকম্পা

ক্ষমা ও অনুকম্পা প্রদর্শন করতে কখনো লজ্জা কিংবা বেদনা বোধ করো না । কাউকে শাস্তি দেবার ক্ষমতা আছে বলে কখনো পুলকিত বা গর্ব বোধ করো না ।

অধীনস্থদের ব্যর্থতায় ক্রোধান্বিত হয়ো না। অধস্তন কর্মচারীদের ভুলের প্রতি রাগান্বিত কিংবা অধৈর্য হয়ো না। তাদের প্রতি সহনশীল ও সহানুভূতিসম্পন্ন হও। প্রশাসনে ক্রোধ কিংবা প্রতিশোধের ইচ্ছা কোন কাজেই আসবে না ।

মানুষকে এ কথা মনে করিয়ে দিতে যেও না যে, তুমি গভর্নর, অশেষ ক্ষমতাধর এবং প্রত্যেককে অবশ্যই তোমার প্রতি বিনীত, আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে এবং তোমাকে মেনে চলতে হবে। এ ধরনের আত্মম্ভরিতা তোমার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করবে, দাম্ভিক করে তুলবে, ঈমান দুর্বল করবে এবং তোমাকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য শক্তির সাহায্য কামনা করতে বাধ্য করবে।

গর্ব ও ঔদ্ধত্য

যদি তোমার মনে কখনো অহমিকা স্থান পায়, সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ কর তোমার উপর আল্লাহর মহান শক্তি ও ক্ষমতা-প্রভাবের কথা, তাঁর সৃষ্টির বিশালত্ব, এমন কি তোমার একান্ত ঘনিষ্ঠ ব্যাপারেও তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং তোমার ক্ষমতার বাইরে যেখানে তোমার শক্তি একেবারেই ক্ষীণ সেখানেও তাঁর কর্তৃত্বের প্রতি চিত্তকে নিবিষ্ট করবে। এ ধরনের ধ্যান তোমার অহংবোধে আঘাত হানবে, তোমাকে আত্মম্ভরিতা ও বিদ্রোহ থেকে দূরে রাখবে, তোমার ঔদ্ধত্যকে বিনাশ করবে এবং তোমার হারানো সুস্থতা ফিরিয়ে আনবে।

সাবধান ! কখনো ক্ষমতার দিক থেকে সমকক্ষতা দাবি কিংবা গৌরব, মহত্ত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে প্রতিযোগিতা করার কথা চিন্তাও করো না, কেননা আল্লাহ্ পাপী ও নিপীড়কদের নত করে দেন এবং যারা তাঁর মত ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী হবার ভান করে, তাদের অপদস্থ করেন।

সাম্য ও ন্যায়বিচার

তোমার উপর আল্লাহ্ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব প্রতিপালনের জন্য কষ্ট স্বীকার কর । মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নিও না। একদিকে আল্লাহ্ ও সাধারণ মানুষ এবং অন্যপক্ষে তোমার আপন আত্মীয়, বন্ধু ও প্রিয়জন সম্পর্কিত বিষয়ে সতর্ক থেকো।

মনে রেখো, যদি তুমি সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে কাজ করতে ব্যর্থ হও তাহলে অত্যাচারী ও নিপীড়ক বলে পরিগণিত হবে, যে আল্লাহর সৃষ্টিগুলোর প্রতি অবিচার করে, সে আল্লাহকে নিজের বৈরী করে ফেলে এবং মজলুমের ঘৃণা অর্জন করে । আল্লাহ্ যার বিরুদ্ধে চলে যান এবং যার প্রতি অসন্তুষ্ট হন তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে অনুতপ্ত হয়, আল্লাহ্ তার বৈরী থেকে যান ।

মনে রাখবে মালিক, এ বিশ্বে আল্লাহর রহমত থেকে কাউকে বঞ্চিত রেখে আল্লাহর রোষ আমন্ত্রণ করার মতো অপরাধ আর কিছু নেই। তাঁর সৃষ্টির উপর জুলুম ও নিপীড়নের চেয়ে আর কিছুতেই আল্লাহ্ তা’আলা রোষাগ্নি প্রজ্বলিত করেন না। তিনি সব সময় মজলুমের দো’আ শুনে থাকেন এবং সর্বক্ষণ শাস্তি দেওয়ার জন্য জালিমদের খোঁজ করেন।

সাধারণ মানুষ ও সুবিধাভোগী শ্রেণী

খুব মিঠেও নয় খুব কড়াও নয় বরং সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক একটা নীতি তোমার গ্রহণ করা উচিত, এমন একটা নীতি বহুল প্রশংসিত হবে।

গুটি কয়েক সুবিধাভোগী লোকের সমর্থন ও সন্তুষ্টির চেয়ে তুমি সাধারণ ও নিপীড়িত জনগণের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হবে ।

যদি সাধারণ জনগণ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে তবে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর অসন্তোষ তোমার প্রভুর কাছে গুরুত্ব লাভ করবে না।

আসলে একটা সরকারের স্থায়িত্বই জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল

তুমি মনে রাখবে মালিক, এ মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী শ্রেণী হচ্ছে মানব সমাজের আবর্জনা। তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা (১) সমৃদ্ধির সময় রাষ্ট্রের উপর সবচেয়ে বড় বোঝা, (২) অভাব ও সংকটের সময় তারা সবচেয়ে কম উপকারী, (৩) তারা সাম্য ও ন্যায়কে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, (৪) রাষ্ট্রীয় সম্পদে তাদের দাবির ব্যাপারে তারা সবচেয়ে নাছোড়বান্দা, (৫) তারা কখনোই প্রদত্ত অনুগ্রহে তৃপ্ত নয়, (৬) সমস্ত অনুগ্রহের ব্যাপারেই তারা সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ, (৭) যখন তাদের দাবিগুলো যথার্থভাবেই অগ্রাহ্য করা হয়, তখন তারা এর পেছনে যুক্তিগুলো মেনে নিতে সবচেয়ে নিস্পৃহ ও অনাগ্রহী, (৮) আর যখন সময় ও ভাগ্য পরিবর্তিত হয়, তাদেরকে তখন তাদের বিশ্বাসের উপর মোটেও স্থির থাকতে দেখা যায় না, এ সমাজের সম্পদগুলোর জন্যে তারা হচ্ছে সবচেয়ে বড় নর্দমা।

এ সমস্ত লোকের বিপরীত সাধারণ মানুষ, দরিদ্র ও কম সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী হচ্ছে ইসলামের খুঁটি। তারা হচ্ছে মুসলিম সমাজের আসল শক্তি। ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তারা সদা সতর্ক সৈনিক হিসেবে কাজ করে। সুতরাং তাদের প্রতি তোমার মনের দুয়ার খুলে দাও, তাদের সাথে আরো বন্ধুভাবাপন্ন হও এবং তাদের সহানুভূতি ও আস্থা অর্জন কর।

নিন্দুক, খয়ের খাঁ ও রটনাকারীদের পরিহার

গুরুত্বপূর্ণ বা সাধারণ মানুষ যে-ই হোক, তার সাথে সাক্ষাৎ ও বন্ধুত্বের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর ।

ধামাধরা ও খয়ের খাঁদের থেকে দূরে থাকবে, যারা অপরের খুঁত খোঁজে আর কুৎসা রটনাতে নিয়োজিত তাদেরকে শত্রু বলে মনে করবে।

এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, মানুষের মধ্যে দোষত্রুটি ও দুর্বলতা থাকবে । মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয় । এ সবকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার একজন শাসকের চেয়ে আর কার বেশি থাকতে পারে ?

স্মরণ রেখো, একজন নিন্দুক অত্যন্ত হীন প্রকৃতির ও বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন লোকসে তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও একনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে দেখাতে চাইলেও আসলে সে অত্যন্ত নীচ ও শঠ। তাদের উপদেশ নেওয়ার ব্যাপারে ধীরস্থির বিবেচনা প্রয়োজন ।

ভুলত্রুটিগুলো উপেক্ষা কর

অতএব তুমি অবশ্যই গোপন ভুলক্রটিগুলো অনুসন্ধান করতে যাবে না । ওগুলো আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। দৃশ্যমান ত্রুটি ও ব্যর্থতাগুলোর ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব হচ্ছে, কি করে সেগুলো সংশোধন করতে হয় সে ব্যাপারে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া ।

কখনো অপরের ভুল ফাঁস করে দেবার চেষ্টা করো না। প্রতিদানে তুমি যে ভুলটা মানুষের কাছে গোপন রাখতে চাও আল্লাহ্ তা ঢেকে রাখতে পারেন ।

বিশ্বাসভাজন ও টাউট

তোমার জনগণের মধ্য থেকে হিংসা দূর করার চেষ্টা কর। মানুষের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়িও না। অ-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করে যাও। তোমার অনুগ্রহ বণ্টন ও আস্থা স্থাপন যেন মানুষের মধ্যে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি না করে । প্রত্যেকের ব্যাপারেই সৎ ও নিরপেক্ষ হও। তোমার ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও অনুগ্রহ যেন হিংসা ও বিদ্বেষ উদ্রেকের উৎস না হয়; যে ব্যক্তি তোমার নৈকট্য ও আনুকূল্য পাবার যোগ্য নয়, সে যেন তোমার কাছে আসতে না পারে। কখনো তোমার সম্মান ও মর্যাদা নীচু করবে না ।

উপদেষ্টা

কৃপণদের থেকে কখনো উপদেশ গ্রহণ করবে না—যারা তোমাকে ঔদার্যপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং তোমার মধ্যে দারিদ্র্যের ভীতি সৃষ্টি করবে ।

একইভাবে ভীতু ও কাপুরুষদেরও উপদেষ্টা বানিও না। যেহেতু তারা সব সময়ই তোমার দায়িত্ব পালনে নিরুৎসাহী করবে এবং আদেশ-নির্দেশ প্রদান ও কার্যকরী করার ব্যাপারে দুর্বল করে তুলবে।

তারা তোমার ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করবে, তোমাকে দুর্বলচিত্ত করে দেবে এবং যে সমস্ত বিষয়ে সাহসের প্রয়োজন সেই সব বিষয়ে তোমাকে ভীরু করে তুলবে। লোভী ও অর্থগৃধুদেরও তোমার উপদেশদাতা বানিও না, কেননা তারা তোমাকে শোষণের পরামর্শ দেবে, তোমাকে লোভী করে তুলবে, দুর্নীতিকে খাঁটি অপরাধ বানিয়ে দেবে এবং অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর জন্য তোমাকে প্রভাবিত করবে।

তুমি ভুলে যাবে না যে, কৃপণতা, কাপুরুষতা ও লোভ ভিন্ন প্রকৃতির বলে মনে হতে পারে যদিও এগুলো সব সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাসহীনতার কু-প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত ।

উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের নির্বাচন

তোমার নিকৃষ্টতম মন্ত্রণাদাতারা হবে তারা, যারা তোমার পূর্ববর্তী শোষক ও নিপীড়কদের মন্ত্রী/উপদেষ্টা/মন্ত্রণাদাতা থেকে তাদের অন্যায়, অপরাধ ও নৃশংসতার সহযোগী ছিল ।

প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার দিক থেকে তাদের সমমানের ব্যক্তি তুমি সহজেই পেতে পার। অথচ তাদের মত তারা তাদের ঘাড়ে সেই পাপের বোঝা বহন করে না। তারা সেই ব্যক্তি যারা কখনো কোন নিপীড়ককে সাহায্য সহযোগিতা করে নি।

এ সমস্ত লোকই সবচেয়ে কম ক্ষতিকর এবং সবচেয়ে বড় সহযোগী প্রমাণিত হবে।

যদি তুমি তাদেরকে কাছে টেনে নাও, তবে তারা, তাদের সাথে যদি শত্রুপক্ষের কোন সম্পর্ক থাকে তার সাথে, সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এ সমস্ত লোককে ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় কাজে তোমার সাথী বানাও ।

শুধু ঐ সমস্ত ব্যক্তির উপর তোমার আস্থা স্থাপন কর, যারা তোমার সমালোচনায় সবচেয়ে স্পষ্ট এবং যারা তোমার পদমর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতি যে কোন ধরনের ভীতি ছাড়াই যে কোন অপ্রিয় সত্য কথা বলবে। যে সমস্ত কাজ তোমার পছন্দসই হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় তারা সে সমস্ত কাজে তোমাদেরকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানাবে ।

চাটুকারদের সঙ্গ এড়িয়ে চলা

রাষ্ট্রীয় কাজে সত্যনিষ্ঠা, ধর্মপ্রাণ ও সৎ লোকদের সংগ্রহ করে তাদেরকে তুমি যে সমস্ত কাজ করনি সে সমস্ত কাজের কৃতিত্ব তোমার উপর চাপিয়ে তোষামোদ করার প্রবণতা বন্ধ করার জন্য প্রশিক্ষণ দাও।

যারা মিথ্যা প্রশংসা করে আনুকূল্য চায় তাদের ত্যাগ কর। তোষামোদ ও মিথ্যা প্রশংসা তোমাকে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মগর্বিত করে তুলবে এবং তোমার মধ্যকার প্রকৃত মানুষটিকে অন্ধ করে তোমাকে করে তুলবে গর্বোদ্ধত।

ভালো ও মন্দের পার্থক্য

ভালো আর মন্দের সাথে তুমি একই রকম আচরণ করবে না। এটা যদি তুমি কর তাহলে তুমি ভালো মানুষকে ভালো কাজ থেকে দূরে সরিয়ে ফেলবে এবং দুষ্কৃতকারীদেরকে কুকর্মে উৎসাহ দেওয়া হবে। সুতরাং যে যে রকম কাজ করে, তোমার কাছ থেকে তার সে রকম আচরণই লাভ করা উচিত।

আস্থাভাজন হও

তোমার মনে রাখা প্রয়োজন, একজন শাসক জনগণের মধ্যে আনুগত্য ও সুনাম ক্রমাগত সৃষ্টি করতে পারে, শুধু যদি সে তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও সহানুভূতিসম্পন্ন হয়, তাদের বোঝা হাল্‌কা করে দেয়, তাদের ক্ষমতার বাইরে কর বসানো পরিহার করে, তাদের উপর জুলুম ও নিষ্পেষণ না চালায়, তাদের শক্তির বাইরে কোন দায়িত্ব না চাপিয়ে দেয়।

সুতরাং তোমার কাজ ও আচরণ এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে তুমি তাদের আস্থা অর্জন করতে পার । এমন কিছু করবে না যাতে তুমি তাদের অবিশ্বাসের কারণ হয়ে ওঠো। তোমার উপর তাদের আস্থা, তোমার উদ্বেগ ও আশংকা বহুলাংশে কমিয়ে দেবে।

এমন সব লোকের উপর তোমার আস্থা স্থাপন করা উচিত যাদেরকে তুমি বিচার ও পরীক্ষা করার পর বন্ধু বানিয়েছ এবং আস্থা স্থাপন করেছ।

এমন সব লোকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না যারা নিজেদেরকে অবিশ্বস্ত, অদক্ষ ও অযোগ্য প্রমাণ করেছে এবং যারা অন্যায়ভাবে মনে করে যে, তুমি তাদের প্রতি নির্দয় ও রুক্ষ ব্যবহার করেছ।

ভালো ঐতিহ্যের সংরক্ষণ

কল্যাণকর ঐতিহ্য, রীতি ও আচার-ব্যবহার এবং পূর্ববর্তী প্রশাসন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আইন-কানুন ও রীতি যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও সৌহার্দ্যবোধ দৃঢ় হতো সেগুলো তুমি ভেঙে দিও না বা পরিবর্তন করো না ।

মনে রেখো, এ সমস্ত মহৎ ঐতিহ্য ও রীতির উপরেই জনগণের মধ্যে শান্তি ও সুনাম নির্ভর করবে।

এমন কোন অভিনব কিছুর প্রচলন করো না যা কোন কল্যাণকর প্রাচীন ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যারা এ সমস্ত অভিনব রীতি চালু করেছে তারা তার জন্য প্রতিদান লাভ করবে; কিন্তু পূর্বতন কল্যাণকর ঐতিহ্য ভঙ্গের জন্য লাভ করবে শাস্তি ।

বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার স্বাধীনতা

তোমার জানতে হবে মালিক, তোমাকে যে জনগণের উপর শাসক নিযুক্ত করা হয়েছে, তারা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রত্যেক শ্রেণীর সমৃদ্ধিই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে এতখানি পরস্পর নির্ভরশীল যে, গোটা সমাজ কাঠামোটাই যেন একটা ঘনভাবে বোনা জাল । অপর অংশের কার্যকর সহযোগিতা ও সদিচ্ছা ছাড়া কোন একটা দলই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে না।

তাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য আল্লাহ্ সেনাবাহিনী, পরবর্তী শ্রেণী হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সচিবরা, তৃতীয় দলটি হচ্ছে বিচার কাজ নিশ্চিতকরণের কাজে নিয়োজিত কাযী ও ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ। চতুর্থ দলটি হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে যাঁরা দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেন। তারপর আসছে সাধারণ মানুষ– মুসলমান যারা সরকারী কর প্রদান করে এবং অমুসলিম যারা করের বদলে জিযিয়া কর দেয়। তারপর আসছে সমাজের পাদ প্রদেশের দোকানদার, শিল্পী ও কারিগর, যাদেরকে তুমি দরিদ্র ও নির্যাতিত দেখতে পাবে ।

এ সব প্রত্যেকটা শ্রেণীর অধিকার ও কর্তব্য রাহমানুর রাহীম আল্লাহ্ তাঁর কালামে পাকে ব্যাখ্যা করেছেন এবং রাসূলের হাদীসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন, এর একটা সম্পূর্ণ নমুনা আমাদের সাথে মজুদ রয়েছে।

সেনাবাহিনী

আল্লাহর আদেশে সেনাবাহিনী ও পুলিশ রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় একটা দুর্জয় দুর্গের ভূমিকা পালন করে। তারা একজন শাসকের জন্য অলংকার, তারা একটা শক্তির উৎস, ঈমানদারদের মর্যাদা ও শান্তি ।

যারা মানুষের মধ্যে শান্তি নিশ্চিত করে, তারা হচ্ছে নিরাপত্তার অভিভাবক যাদের মাধ্যমে দক্ষ অভ্যন্তরীণ প্রশাসন সুনিশ্চিত হতে পারে ।

জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা তাদেরকে ছাড়া রক্ষা করা অসম্ভব ।

সেনাবাহিনীর সংরক্ষণ তাদের জন্য আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত করের উপর নির্ভরশীল। এই কর দিয়ে তারা নিজেদের ভরণ-পোষণ, অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো এবং ঈমান ও ন্যায়ের পথে সংগ্রামে শত্রুদের পরাভূত করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সদা প্রস্তুত থাকে । 

বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও সচিবালয়

যদিও জনগণ ও সেনাবাহিনী দু‘টো গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী, তাদের স্বাচ্ছন্দ্য অন্যান্য শ্রেণীর; যথা—বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও সচিবালয়ের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব । প্রথমটি বিচার চালায়, দ্বিতীয়টি রাজস্ব সংগ্রহ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে এবং তৃতীয় দলটি তাদের সাধারণ কল্যাণ ও বিশেষ বিষয়াবলী বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অধিকার ও দায়িত্বের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করে।

ব্যবসায়ী ও কারিগর

উপরিউক্ত কাঠামোর কল্যাণ নির্ভর করে আবার ব্যবসায়ী, শিল্পী ও কারিগরদের উপর। তারা সরবরাহকারী ও ভক্তদের মধ্যে মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করে। তারা লাভের আশায় দোকান, বাজার ও ব্যবসা কেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপন করে। কারিগররা তাদের নির্মাণ কার্য দিয়ে সমাজকে এমনভাবে সাহায্য করে, যা অদক্ষ শ্রম দিয়ে সম্ভব নয়।

দরিদ্র ও পঙ্গু

দরিদ্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম শ্রেণী হচ্ছে পঙ্গু, দরিদ্র ও ছিন্নমূল গোষ্ঠী। তারা অন্যান্য মানুষের নিকট থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা পাবার যোগ্য ।

এই শ্রেণীভুক্ত প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জীবন নির্বাহের জন্য আল্লাহ্ বহু কিছু দিয়েছেন প্রত্যেক গোষ্ঠীরই অধিকার রয়েছে একটা সুখী জীবনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বস্তু রাষ্ট্র থেকে পাবার ।

মনে রাখবে, আল্লাহ্ কোন শাসককেই তার দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে অব্যাহতি দেবেন না, যদি সে তার দায়িত্ব পালনে যথাসাধ্য প্রয়াস না পায় এবং ন্যায় ও সত্যের পথ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ না করে এবং মানুষের প্রতিক্রিয়া অনুকূল বা প্রতিকূল যা-ই হোক না কেন, এ সবই সে ধীরস্থিরভাবে সয়ে নেয় ।

সেনাবাহিনীর সেনাপতিবৃন্দ

এমন কাউকে সেনাপতি নিয়োগ করবে, যে তোমার মতে সবচেয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্, নবীজী ও তোমার ইমামের প্রতি নিবেদিত, যাঁর একটা স্বচ্ছ বিবেক রয়েছে, যাঁর ধার্মিকতা, জ্ঞান ও ভদ্র আচরণের জন্য খ্যাতি রয়েছে, যিনি হঠাৎ রেগে যান না, অজুহাতকে সহৃদয়তার সাথে বিবেচনা করে থাকেন, যিনি সবলদের প্রতি শক্তি প্রয়োগ, কঠোরতা ও দুর্বলদের প্রতি দয়ার্দ্র চিত্ত ও মহানুভবতা প্রদর্শন করে থাকেন, যিনি হবেন প্রতিশোধপরায়ণতা ও জিঘাংসার মনোভাব হতে মুক্ত যা মানুষকে শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করে। হীনম্মন্যতা হতে তাকে মুক্ত হতে হবে যা তার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে মানুষকে অসহায় করে তোলে। ভালো সেনাধ্যক্ষ বাছাই ও যোগ্য অফিসার নিয়োগের জন্য তোমাকে এমন সব লোকের সঙ্গে মিশতে হবে ও সম্পর্ক রাখতে হবে, যারা বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে উন্নত এবং যারা ধার্মিকতা, সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় বীরত্বপূর্ণ কাজের সুমহান ঐতিহ্যের অধিকারী। সাধারণত এসব লোকই সর্বোত্তম চরিত্রের ধার্মিকতার আদর্শ ও মহান কার্যাবলীর প্রেরণা প্রদানকারী উৎস হিসাবে পরিগণিত হতে থাকবে, এভাবে বাছাইকৃত লোকদের কাজকর্মের প্রতি পিতৃসুলভ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে যাতে তাদের কোন দোষত্রুটি অতি সহজে তোমার নিকট ধরা পড়ে। তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং এতে তোমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও আস্থাশীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে ।

যে সব প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদেরকে শক্তিশালী করা হয়েছে সুবিবেচনার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অতিরঞ্জিত করো না। তাদের ছোটখাট অভাব পূরণে উদাসীনতা প্রদর্শন করো না। যদিও প্রধান প্রয়োজনাদি পূরণ করাটা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ, তথাপি অনেক সময় ছোটখাট প্রয়োজনের প্রতি নজর প্রদান ও অনুগ্রহ প্রদর্শন অত্যধিক ফলপ্রসূ হয়ে থাকে । তাদের বড় বড় বিষয়ের প্রতি যথাযথ নজর প্রদান করা হয়েছে একমাত্র এ অজুহাতে ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোকে খাটো করো না ।

সেনাবাহিনীর অফিসারবৃন্দ

যেসব সামরিক কর্মকর্তা তাদের শত্রুসৈন্য ছাড়া অন্য সব অধীনস্থ সৈনিকের সর্ব প্রকারের দুঃখ-দুর্দশা দূরীকরণে অত্যধিক মনোযোগী ও তৎপরতা প্রদর্শন করে থাকে, তারাই সামরিক সম্মান ও বিবেচনার যোগ্য বিবেচিত হবে। এসব অফিসার তাদের সৈনিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুখশান্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সহায়-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করে থাকেন যেন পরিবার ও সন্তান-সন্ততির চিন্তামুক্ত হয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে জীবন যাপন করতে পারে। এমনই ভাবে তুমি তাদের অন্তরকে জয় করে নেবে। তারা সর্ববিধ চিন্তাভাবনামুক্ত মন নিয়ে সাহসিকতা ও পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে যুদ্ধ করে যাবে। তোমার অফিসার ও সৈনিকদের প্রতি সদা যত্নবান থাকার কারণে তারাও তোমাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালবাসতে থাকবে ।

ন্যায়নীতি, সুবিচার ও ইনসাফ

একজন শাসকের জন্য এটাই সবচাইতে একমাত্র বড় আনন্দ ও তৃপ্তি যে, তাঁর দেশ ন্যায়নীতি, সুবিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং শাসকের প্রতি নাগরিকদের মনে আস্থা ও ভালবাসার মনোভাব বিরাজ করছে।

তোমার লোকেরা তোমাকে কিছুতেই ভালবাসতে পারে না যদি তারা অসুখী থাকে এবং তুমি তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হও। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমার শাসনকে অবাঞ্ছিত ও বোঝা মনে করতে থাকবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য এগিয়ে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার কিছুতেই মনে করা উচিত হবে না যে, তারা তোমার শাসনের সমর্থক। তোমার সরকারের তারা ধ্বংস চাইবে না, যদি না তাদের কাছে তোমার সরকার অসহ্য বোঝার মত হয়ে ওঠে। 

সুতরাং তোমার কাছে তারা যা সঙ্গতভাবে আশা করে তুমি তা তাড়াতাড়ি পূরণ করার ব্যবস্থা করো ।

ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান

যারা প্রশংসাযোগ্য তাদের প্রশংসার ব্যাপারে উদার হও, তাদের ভালো কাজকে উৎসাহ দাও, আর সাহসী লোকদের মহৎ সাফল্যের ব্যাপক প্রচারণা দাও ।

ভালো কাজের ব্যাপক প্রচারণা সাহসীদের মধ্যে জাগাবে আরো বেশি উৎসাহ আর ভীরু ও কাপুরুষদের করে তুলবে সাহসী।

আবার কে কি করেছে সে বিষয়ে তোমার ভালোভাবে জানা থাকতে হবে, যাতে একজনের কৃতিত্ব আরেকজনের কাঁধে চাপানো না হয় ।

যে তার ভালো কাজের জন্য যথার্থভাবেই যোগ্য তার অবমূল্যায়ন কিংবা পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করো না ।

এভাবেই একটা কাজকে তোমার অতি মূল্যায়ন করাও উচিত নয় শুধু এ কারণে যে, সেটা করেছেন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তার অবস্থান ও মর্যাদা তার কাজের গুরুত্বকে বাড়িয়ে তোলার জন্য তোমাকে যেন প্রভাবিত না করে। একই সাথে একজন সাধারণ মানুষের করা মহৎ কাজকে উপেক্ষা করো না। সাম্য, ন্যায় ও সততা যেন তোমার মূল উদ্দেশ্য হয় ।

আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা

যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, অনিশ্চয়তা তোমার মনের একাগ্রতাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, তুমি তখন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আশ্রয় নেবে।

যাদেরকে আল্লাহ্ সঠিক পথ দেখাতে চান তাদেরকে এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং যারা তোমাদের মধ্যে কর্তৃত্বশীল তাদের আনুগত্য কর, আর তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিষয়ে বিবাদ উপস্থিত হয় তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের হাতে ছেড়ে দাও।”

আল্লাহর হাতে কোন বিষয় ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাঁর কালাম থেকে নির্দেশনা ও উপদেশ খোঁজা আর নবীর হাতে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাঁর এমন সব হাদীস অনুসরণ করা যেগুলো সন্দেহের ঊর্ধ্বে।

বিচার বিভাগ

জনগণের বিচার কাজ চালানোর জন্য তোমাকে সুবিবেচক হতে হবে ।

এ উদ্দেশ্যে উন্নত চরিত্র, মেধাবী, উঁচু মনের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নির্বাচন করা উচিত।

তাদের অবশ্যই নিম্নরূপ গুণাবলীসম্পন্ন হতে হবে :

১. সমস্যার জটিলতা কিংবা সংখ্যার আধিক্যের কারণে তাদের কখনোই মেজাজের ভারসাম্য হারানো উচিত নয়।

২. যখন তারা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, তার প্রদত্ত রায় ভুল হয়েছে তা সংশোধন করা কিংবা সে রায় বদলে দেওয়া তাদের পক্ষে মোটেও মর্যাদাহানিকর ভাবা উচিত নয় ।

৩. তারা লোভী, দুর্নীতিপরায়ণ ও চরিত্রহীন হতে পারবে না ।

৪. যতক্ষণ পর্যন্ত না একটা অভিযোগের এদিক ও সেদিক আগাগোড়া যাচাই করে না দেখা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিশ্চিত হওয়া অনুচিত, যখন অস্পষ্টতা ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তখন আরো বিস্তৃত অনুসন্ধান চালিয়ে বিষয়গুলো স্পষ্ট করে নিয়ে তারপর রায় দিতে হবে।

৫. তাদের অবশ্যই যুক্তি-প্রমাণের উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং তাদের কখনোই মামলাকারীর দীর্ঘ কৈফিয়ত শোনবার ব্যাপারে অধৈর্য হলে চলবে না। বিশদ বিবরণের সূক্ষ্ম নিরীক্ষণে এবং বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের মাধ্যমে মিথ্যা থেকে সত্যে উপনীত হবার কাজে অবশ্যই ধীরস্থির এবং অধ্যবসায়ী হতে হবে। আর এভাবে যখন সত্য আবিষ্কৃত হবে, তখন তাদের নির্ভয়ে রায় প্রকাশ করে বিবাদের ইতি টানতে হবে।

৬. যাদের প্রশংসা করা হলে আত্মদর্শী হয়ে ওঠে এবং যারা তোষামোদে গলে যায় আর

চাটুকারিতা ও প্ররোচনায় বিপথগামী হয় তাদের মধ্যে যেন কেউ বিচারক না হয় ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ সমস্ত গুণসম্পন্ন লোক খুব কমই দেখা যাবে। যখন তুমি বিচারক নিয়োগ করবে, তাদের কিছু কিছু বিচারের রায় ও ধারা বিবরণী তুমি আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবে। সাথে সাথে তুমি তাদের জন্য একটা ভালো পরিমাপের ভাতা নির্ধারণ করে দিও, যাতে তাদের সমস্ত বৈধ প্রয়োজনগুলো মিটে যায় আর তারা যেন অপরের থেকে চাইতে কিংবা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয়।

তোমার সরকারের মধ্যে তাদেরকে এমন একটা মর্যাদা ও সম্মান এবং তোমার ঘনিষ্ঠতা নিশ্চিত করবে, যেন তোমার কোন অফিসার বা সভাসদ কেউই তাঁদেরকে ভীত কিংবা তাঁদের উপর কর্তৃত্ব না করতে পারে ।

বিচার বিভাগকে অবশ্যই সব ধরনের প্রশাসনিক চাপ ও প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হবে, ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, একে অবশ্যই ভীতি ও পক্ষপাতহীন হয়ে কাজ করে যেতে হবে।

বিষয়টা ভাল করে ভেবে দেখ আর বিশেষত এ দিকটার উপর গুরুত্ব দাও, কারণ তোমার নিযুক্তির আগে এ রাষ্ট্রটা দুর্নীতিপরায়ণ ও দাগাবাজদের অধীনে ছিল। এসব লোভী ও জঘন্য ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রটাকে শোষণ করেছে এবং সম্পদ অর্জন এবং অন্যান্য পার্থিব বস্তু অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসকবৃন্দ

রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা প্রশাসকবৃন্দের কাজকর্ম দেখাশোনার দায়িত্ব তোমার, তাদের চরিত্র, যোগ্যতা ও আচরণ ভাল করে পরীক্ষা করার পর তাদেরকে নিযুক্ত করা উচিত। পরীক্ষার ভিত্তিতে এবং কোন ধরনের পক্ষপাত ও অপরের প্রভাবমুক্ত থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া উচিত।

যদি তুমি অফিসারদের নিছক প্রতিপালন ও সাহায্য করার উদ্দেশ্যে নিয়োগ করে থাক তাহলে তা অবিচার, অত্যাচার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার ও দুর্নীতির রূপ পরিগ্রহ করবে। অভিজাত বংশীয়, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও প্রাথমিক যুগে যারা ইসলামের জন্য আত্মত্যাগ করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমার কর্মকর্তা নিয়োগ কর। উন্নত চরিত্র ও অত্যন্ত ভদ্র ও শরীফ হলে তারা সহজেই লোভ ও দুর্নীতির শিকার হয়ে পড়বে না, যেহেতু তারা তাদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে অসচেতন নয় ।

তাদেরকে ভালো বেতন দিও, যেন তারা নৈতিক অধঃপতনের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, এটা তাদের নিজেদের উপর আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং তারা যে তহবিলের জিম্মাদার তার উপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ করবে। মোটা ভাতা পাবার পরও যদি তারা তহবিল তসরুপ করে আর নিজেদেরকে অসাধু প্রমাণ করে তাহলে তুমি তাদেরকে শাস্তি দেবার জন্য একটা সংগত কারণ পাবে। সুতরাং তাদের কাজের পদ্ধতি ও খুঁটিনাটির উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবে এবং তাদের নিযুক্তির পর স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে রাখবে না ।

এ সমস্ত কর্মকর্তার কাজ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য তোমার সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ করা উচিত, যদি তারা জানে যে, তাদের কার্যাবলী গোপনে দেখা হচ্ছে তাহলে তারা অসাধুতা ও অসৎকর্ম থেকে বিরত থাকবে।

জনগণের প্রতি আন্তরিকতাপূর্ণভাবে নিবেদিত হও এবং তোমার সরকারকে অসাধু কর্মকর্তাদের অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা কর। এরপরও যদি তুমি কোন অফিসারকে অসৎ দেখতে পাও এবং তোমার গুপ্তচররাও যদি তার সমর্থন দেয় তাহলে তুমি অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ করবে।

শাস্তিটা হতে পারে শারীরিক, চাকুরী থেকে বরখাস্তকরণ এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান, তাকে এমনভাবে অপদস্থ করতে হবে যেন সে তার কৃত অপরাধের পরিণতি অনুধাবন করতে পারে। তার অপমান ও শাস্তিকে একটা ব্যাপক প্রচারণা দেওয়া প্রয়োজন, যেন তার জীবনটা হয়ে পড়ে গ্লানি-ঢাকা ও কালিমালিপ্ত আর তা অপরের কাছে শিক্ষা হতে পারে।

কর : রাজস্ব বিভাগ

কর ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তোমার খেয়াল রাখতে হবে যে, রাজস্বের চেয়ে রাজস্বদাতাদের কল্যাণের গুরুত্ব বেশি। রাজস্বদাতাদের কল্যাণের উপরেই বাদবাকি জনসংখ্যার কল্যাণ নির্ভরশীল। মনে রাখতে হবে যে, পুরো জাতিটাই রাজস্ব আদায়ের উপর নির্ভরশীল।

সুতরাং তুমি রাজস্ব সংগ্রহের চেয়ে জমির উর্বরতার উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করবে, যেহেতু রাজস্ব দেওয়ার ক্ষমতা ভূমির উর্বরতার উপর নির্ভরশীল । যে শাসক জমির উর্বরতা ও জনগণের সমৃদ্ধির উপর নজর না দিয়ে কেবল কর আদায়ের জন্য ব্যগ্র থাকে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে ভূমি, রাষ্ট্র ও জনগণের ধ্বংস ডেকে আনে। তার শাসন বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে না ।

যদি তোমার জনগণ বেশি কর আরোপের অভিযোগ আনে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন— অনাবৃষ্টি, সেচ ব্যবস্থার বিপর্যয়, পোকার আক্রমণ, বন্যা ইত্যাদির শিকার হয়ে পড়ে, তাহলে তুমি তাদের কষ্ট অশেষ সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবে এবং তাদের অবস্থার উন্নতির স্বার্থে তাদের কর যথাযথ অনুপাতে কমিয়ে আনবে। এটা তাদের কষ্ট লাঘবে অবদান রাখবে ।

ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় তহবিলের সঙ্কোচন যেন তোমাকে বিচলিত ন করে, কেননা একজন শাসকের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে জনগণকে তাদের সংকটের সময় সাহায্য করা।

বস্তুত করদাতাগণ হচ্ছে একটা দেশের প্রকৃত সম্পদ এবং যে কোন বিনিয়োগই তোমার নগরী তথা সমগ্র জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে তারা ফিরিয়ে দেবে। তাদের রাজস্বের সাথে সাথে তুমি তাদের ভালোবাসা, সম্মান ও প্রশংসা লাভ করবে। ন্যায় ও সততা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রকৃত তৃপ্তির আস্বাদ লাভ করবে। এটাই কি স্থায়ী সুখ নয় ?

এদেরকে স্বস্তি উপহার দিয়ে তুমি তাদের সমৃদ্ধির সময় তোমার বিনিয়োগটা উদ্বৃত্ত হিসেবে ফেরত পেতে পারো এবং প্রয়োজনের সময় তা কাজে লাগাতে পারো। তোমার সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ, বদান্যতা, মহানুভবতা ও ন্যায় বিচার এক ধরনের নৈতিক প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করবে এবং তাদেরকে সততা ও ন্যায়ের সাথে অভ্যস্ত করে তুলবে। একটা সুখী ও সমৃদ্ধ জনসমষ্টি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এবং তোমাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করবে ।

আসলে এ ধরনের জনগণ হবে তোমার শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। যখন তুমি কোন অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের মুখোমুখি হবে এবং তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হবে, তারা আনন্দের সাথে তোমার বোঝার অংশীদার হবে। একটা সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী যে কোন বোঝা বইতে পারে, কিন্তু দরিদ্র জনগণ হচ্ছে একটা দেশের অধঃপতন ও ধ্বংসের মূল কারণ ।

গভর্নর ও কর্মকর্তাদের অর্থোপার্জনের প্রতি মোহ, তা সৎ বা অসৎ যে কোন পন্থায়ই হোক, দারিদ্র্যের একটা কারণ হতে পারে। যদি তারা কেবল তাদের পদ হারাবার ভয়ে অস্থির থাকে তাহলে তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে যতটুকু বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব তার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে দেবে। তারা কখনই বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, আর আল্লাহ্র বাণী নিয়ে মাথা ঘামায় না।

সচিবালয়

যারা নির্দেশসমূহ জারি করে থাকে ঐ সমস্ত কর্মকর্তার প্রতি তোমাকে গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। তোমার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত ও অন্যান্য গোপনীয় ব্যাপারে তাদের মধ্য হতে যোগ্যতমদের বাছাই করে ঐ দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে।

এ সমস্ত ব্যক্তির নির্বাচনের পর তাদের হাতে তোমার চিঠিপত্র, গোপনীয় দলিলপত্র ও পরিকল্পনার কাজ করতে দাও। তাদের অবশ্যই সৎ, চরিত্রবান ও নীতিবান হতে হবে যেন ক্ষমতা ও পদমর্যাদা তাদেরকে জনসমক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে বলতে, তোমার আদেশ উপেক্ষা করতে, মিথ্যা প্রচারণা চালাতে ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি তোমার কাছে হাযির করতে বিলম্ব করার সাহস না হয়।

তারা যেন কিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র ও বিষয়বস্তু নিয়ে অহেতুক বিলম্ব না ঘটায়। যখন কর্মকর্তাবৃন্দ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তি করতে যায় তুমি লক্ষ্য রাখবে যেন ঐ সমস্ত চুক্তি ত্রুটিহীন হয় এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী না হয়।

রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কোন চুক্তি বা আলোচনায় যেন তারা না যায়। যুক্তির কাঠামো কিংবা ষড়যন্ত্রের কারণে যদি রাষ্ট্রের অবস্থান হয়ে ওঠে দুর্বল, তাহলে এ সমস্ত চুক্তি ও আলোচনাকে বাতিল করে দেবার মতো শক্তি যেন তাদের থাকে।

তোমার অফিসারদের অবশ্যই আপন পদমর্যাদা, প্রশাসনে তাদের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত থাকতে হবে, কেননা যদি কেউ তার আপন অবস্থান ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না থাকে তাহলে সে কখনো অন্যদের সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে না ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নির্বাচনের জন্য তুমি শুধু তোমার আপন বিচার ক্ষমতা ও ভালো ধারণার উপর নির্ভর করলে চলবে না; কারণ তুমি সামান্য ক’টি ক্ষেত্রেই শুধু তাদেরকে সৎ, বুদ্ধিমান, যোগ্য ও বিশ্বস্ত দেখতে পেয়েছ।

তোমার ভুলে গেলে চলবে না যে, কিছু লোককে যদিও সৎ ও বিশ্বস্ত মনে হয়, আসলে তারা ধার্মিকতার পোশাকে শাসক ও উচ্চপদস্থদের হৃদয় জয় করে নেয় । তারা তাদের প্রশংসা এবং স্বীকৃতিও লাভ করে যদিও তারা বিচক্ষণ কিংবা বিজ্ঞ কোনটাই নয়, আর তাদের অন্তরে বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার লেশমাত্র নেই ।

অফিসার বাছাইটা নির্ভর করা উচিত পূর্ববর্তী শাসনামলের সার্ভিস রেকর্ডের উপর। যোগ্যতা ও সততার সুনামের উপরেই তোমাদের অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করতে

হবে।

তোমার সরকারে বিভিন্ন বিভাগে প্রধানরূপে নিযুক্ত করবে এমন সব লোককে জটিল সব সমস্যার সমাধানের জন্য, যাদের যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রজ্ঞা রয়েছে এবং যারা কঠোর পরিশ্রম করতে সক্ষম। সমাজে অবশ্যই তার সততার জন্য সুনাম থাকতে হবে।

এমন সব কাজ আল্লাহ্ ও যিনি তোমাকে নিযুক্ত করেছেন তাঁর প্রতি তোমার আনুগত্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়াবে। তোমার প্রধান কার্যালয় সেক্রেটারিয়েটের প্রত্যেকটা বিভাগে নিয়োজিত ব্যক্তিদের অধিক ক্ষমতাবান করা যাবে না এবং তারা যেন আপন দায়িত্বের চাপেই ন্যুব্জ থাকে ।

যদি তোমার কর্মকর্তাদের কোন ভুলত্রুটি থাকে আর তুমি যদি তার সংশোধনে উপেক্ষা প্রদর্শন করতে থাক তাহলে তাদের সমস্ত ত্রুটি ও অপকর্ম তোমারই উপর বর্তাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কাজের জন্য তোমাকে দায়ী করা হবে।

ব্যবসায়ী, কারিগর ও শিল্পপতিবৃন্দ

আমি তোমাকে ব্যবসায়ী, কারিগর ও শিল্পপতিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার এবং তোমার অফিসারদেরও একই আচরণ করার নির্দেশ দেওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। তারা হতে পারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা দেশের মধ্যেই ব্যবসা চালায় আর বাকিরা দেশ-বিদেশে আমদানী-রফতানীর কাজে নিয়োজিত থাকতে পারে।

একইভাবে রয়েছে কারিগর, নির্মাণকর্মী ও শিল্পপতি। তাদের সবার সাথে ভালো ব্যবহার করা উচিত এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তারা সবাই তোমার সহানুভূতি, নিরাপত্তা ও সদাচরণের উপযুক্ত। তারা হচ্ছে একটা দেশের সম্পদের উৎস। তারা যে দ্রব্য সরবরাহ করে, তাই জনগণ তাদের অভাব মোচনের কাজে ব্যবহার করে ।

এই সমস্ত লোক বহু দূরদেশ হতে দুস্তর মরু, দুর্লংঘ গিরি আর দুর্গম পথ যেখানে সাধারণ মানুষ যেতে সাহস পায় না, সেখান থেকে পণ্য-সামগ্রী বয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং তারা দেশের অভ্যন্তরে হোক কিংবা বাইরের সাথে হোক তুমি তাদের সুবিধের দিকে নজর দেবে।

সাধারণভাবে তারা একটা শান্তিপ্রিয় ও আইনানুগত সম্প্রদায়, তারা সাধারণত দুষ্কৃতি ও ধ্বংসকর কাজে লিপ্ত হয় না।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সম্পর্কে আরেকটা দিক তোমাকে আমার স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তাদের প্রতি সম্পূর্ণ সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার করার সাথে সাথে তুমি তাদের প্রতি একটা সজাগ দৃষ্টি রাখবে। যেহেতু তারা প্রায়শই চরম স্বার্থপর ও সাংঘাতিক কৃপণ, সম্পদলিপ্সু এবং মজুতদারীর প্রবণতাসম্পন্ন ।

তাদের মধ্যে রয়েছে মজুতদাররা ৷ মজুতদারী ও কালোবাজারীর মাধ্যমে এসব মজুতদার জনগণের জন্য দারিদ্র্য ডেকে আনে এবং প্রশাসক ও কর্মকর্তাদের দুর্ণাম সৃষ্টি করে। সুতরাং তুমি অবশ্যই মজুতদারী ও কালোবাজারীর সমাপ্তি আনবে যা পবিত্ৰ নবীজী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের দ্বারা নিন্দিত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

কোন রকমের বিঘ্ন সৃষ্টি ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয়ের একটা সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে হবে। সমগ্র দেশের জন্য তোমার ওজন ও মাপের একক থাকতে হবে। এমন কোন আইন বা শর্ত থাকা উচিত নয়; যাতে ভোক্তা বা সরবরাহকারীর ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশংকা রয়েছে ।

তাদের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত সুবিধে দেওয়ার পরও যদি তোমার আদেশ লংঘন করে ব্যবসায়ী, কারিগর ও নির্মাতারা মজুতদারী ও কালোবাজারীর আশ্রয় নেয় তাদের বিচার ও সাজা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু সেখানেও শাস্তিটা হবে অপরাধের গুরুত্ব অনুপাতে এবং কোনক্রমেই যেন তা সভ্যতা ও ন্যায়ের সীমা না ছাড়িয়ে যায়।

গরীবদের অধিকার

গরীবদের ব্যাপারে আমি তোমাকে সাবধান করে দিতে চাই। আল্লাহকে ভয় কর এবং গরীবদের অবস্থা ও তাদের প্রতি তোমার মনোভাবের ব্যাপারে যত্নবান হও। এই সমস্ত লোকের কোন সম্পদ নেই, সুযোগের অবারিত দ্বার নেই; তাদের কোন সহায়ও নেই।

এই শ্রেণীটা হচ্ছে দুস্থ, দরিদ্র, ভিক্ষুক, অসুস্থ ও সহায়হীন, যারা হয় ভাগ্যের হাতে নিজেদের সঁপে দিয়েছে নতুবা ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছেন যারা আত্মসম্মানবোধের খাতিরে ভিক্ষার আশ্রয় নেন না, কিন্তু তাদের দুঃখ- দুর্দশা আরো করুণ ।

মালিক, কেবল আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে একজন শাসকের জন্য তুমি আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব হিসেবে তাদের নিরাপত্তা দেবে এবং তাদের অধিকার রক্ষা করবে। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে তুমি তাদের জন্য একটা অংশ নির্ধারণ করে দাও। এই অর্থ সাহায্য ছাড়াও রাষ্ট্রীয় জমিতে উৎপন্ন ফসলের একাংশ তুমি তাদের জন্য নির্ধারণ করে দেবে।

মনে রাখবে, এ সমস্ত উদ্বৃত্ত সম্পদে অবস্থানের দূরত্ব নির্বিশেষে সকল বাসিন্দার অধিকার সমান ।

জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

আমি আবারো তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, গরীবদের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব তোমার। খেয়াল রাখবে, পদমর্যাদা ও সম্পদের জিম্মাদারিতে তোমাকে তোমার গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দায়িত্বগুলো সম্পর্কে অন্ধ না করে দেয়।

তোমার পদটা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, তুমি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলী নিয়ে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও এবং তাতে সফল হবার পরও সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য তোমাকে ক্ষমা করা হবে না।

অতএব গরীবদের কল্যাণের ব্যাপারে তোমার সতর্ক থাকতে হবে। আর কক্ষণই অহংকার ও ঔদ্ধত্যের বশে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না ।

যারা সহজেই তোমার কাছে আসতে পারে না তাদের বিষয়ে অবশ্য তুমি যত্নবান হবে। তারা হচ্ছে এমন সব ব্যক্তি সমাজ যাদেরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখে, যাদের দারিদ্র্য ও অসুস্থতা তোমার চোখে বিস্বাদ ঠেকতে পারে। এ সব দুর্ভাগা লোকদের জন্য তোমার হওয়া উচিত ভালোবাসা, স্বস্তি ও শ্রদ্ধার উৎস।

কেবল তাদের উপরে আস্থা স্থাপন করবে যারা ধর্মপ্রাণ, মুত্তাকী এবং শোষিতের স্বার্থে আন্তরিকতাপূর্ণভাবে নিবেদিত এবং যারা তোমাকে তাদের সম্পর্কে অবহিত রাখবে।

এমন দুর্ভাগাদের প্রতি অবশ্যই তোমার ভালো ব্যবহার করতে হবে, যেন আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য যখন তুমি লাভ করবে, তখন তোমার আচরণ সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পার ।

মনে রাখবে, মানবতার এ শ্রেণীটিই তোমার নাগরিকদের মধ্যে সর্বাধিক সহানুভূতি লাভের যোগ্য। সুতরাং তাদের প্রতি বিশ্বস্ত ও সম্পূর্ণভাবে কর্তব্য পালন করার মাধ্যমে তুমি তোমার স্রষ্টার সম্মুখে মুখ উজ্জ্বল করে দাঁড়াতে পারবে।

অধিকাংশ শাসকের কাছেই এসব দায়িত্ব প্রতিপালন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। যারা আল্লাহ্র পথে চলে এবং তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করে, আল্লাহ্ তাদের কাজকে সহজ করে দেন।

তারা একটা দায়িত্ববোধ ও আনন্দ নিয়ে তাদের কর্তব্য সমাধা করে। তারা তাদের কাজে আনন্দ পায় এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।

জনগণের অভিযোগ শোনা

অন্যান্য কাজের ফাঁকে কিছুটা সময় তুমি দরিদ্র ও মজলুমদের জন্য বরাদ্দ করে রাখ এবং তোমার সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ শুনবার ব্যবস্থা কর ।

এ শ্রুতির সময় আল্লাহ্ ওয়াস্তে তুমি তাদের সঙ্গে দয়া, সৌজন্য ও সম্মানের সাথে ব্যবহার কর। তোমার সরকার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা যেন খোলাখুলিভাবে নিঃসংকোচে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারে, তার স্বার্থে তোমার কর্মচারী সৈনিক বা প্রহরীকে ঐ সময় সেখানে উপস্থিত থাকতে দিও না ।

এটা তোমার প্রশাসনের জন্য অত্যাবশ্যক। আমি নবীজীকে বলতে শুনেছি, “ঐ সব সরকার ও ব্যক্তি মুক্তি অর্জন করতে পারে না যাদের কারণে দরিদ্র ও দুস্থদের অধিকার শক্তিমানদের হাত থেকে রক্ষিত হয় না। ”

এ সব আসরে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ ও দুস্থরা মিলিত হবে তাদের মধ্যে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের কমতি থাকলেও তাদের প্রতি কড়া বাক্য কিংবা বিব্রতকর উক্তি প্রয়োগ করো না। তাঁদের প্রতি রুক্ষ ব্যবহার করে তোমার দম্ভ ও সংকীর্ণ মানসিকতা প্রদর্শন করো না ।

তুমি যদি তাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হও তাহলে দয়াময় আল্লাহ্ তোমাকে তোমার আনুগত্যের জন্য বিরাট পুরস্কার প্রদান করবেন। তাদের অভিযোগ মনোযোগের সাথে শোন এবং তাদের প্রতি সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার কর।

যদি তুমি তাদের প্রতি ‘না’ বলতে বাধ্য হও তাহলে তুমি তোমার অক্ষমতা এমন মধুরভাবে বলবে এবং এতোটা সৌজন্য প্রকাশ করবে যে, তোমার ‘না’ বলাটাও তাদের কাছে ‘হাঁ’ বলার মতোই সুখকর ঠেকে। তোমার প্রত্যেকটা সাহায্য ও উপহারই আন্তরিকতাপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন ।

এমন কিছু বিষয় থাকবে যেগুলো তোমার কোন অফিসারই করতে সক্ষম হবে না, এগুলো তুমি নিজেই সম্পন্ন করবে। তোমার প্রতিনিধি ও প্রশাসকদের প্রতি উত্তর দেওয়াটা, যেগুলো তোমার সচিবদের ক্ষমতার বাইরে, সেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত।

যখন তুমি অনুভব করবে যে, তোমার অফিসাররা জনগণের অভাব-অভিযোগের প্রতি ততটা সচেতন বা আগ্রহী নয়, তখন তুমি নিজেই এতে আপন মনোযোগ নিবদ্ধ করবে।

প্রতিটি দিনের জন্যই তোমার কিছু আবশ্যকীয় দায়িত্ব থাকবে। সুতরাং দিনের কাজ দিনেই সম্পন্ন করবে।

প্রতিটি দিনই তোমার জন্য কিছু বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে থাকবে। সময়ের শ্রেষ্ঠতম অংশটি তোমার স্রষ্টা ও তোমার নিজের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে ব্যয় কর।

খেয়াল রাখবে, যেন রাষ্ট্রের প্রতিটা কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। যদি তোমার কাজের মধ্যে তোমার স্বচ্ছ বিবেক কাজ করে, তবেই তোমার জনগণ সুখী জীবন যাপন করবে।

নিয়মিত ইবাদত

তোমার দৈনিক নামায যেন তোমার ঐসব আবশ্যকীয় কাজের তালিকায় থাকে, যেগুলো তুমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে থাক। দিবারাত্রিকালীন ইবাদতের জন্য তোমার অবশ্যই একটা সময় নির্দিষ্ট থাকতে হবে।

তুমি অবশ্যই একনিষ্ঠ ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে তোমার শরীর থেকে ট্যাক্স আদায় করে নেবে। আন্তরিকতাপূর্ণ ও একনিষ্ঠ ইবাদত তোমাকে আল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে।

শরীরের উপর দিয়ে যত ধকলই যাক না কেন, তুমি তোমার কর্তব্যগুলোকে অসম্পূর্ণ ও অবিন্যস্ত থাকতে দেবে না ।

যখন তুমি ইমামতি করতে যাবে তখন লক্ষ্য রাখবে যেন তোমার নামায এতটা দীর্ঘ না হয় যাতে তোমার মোক্তাদিরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিংবা এতটা সংক্ষিপ্ত না হয় যে, তাতে ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থেকে যায় ।

যখন নবীজী আমাকে ইয়েমেনে পাঠালেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, কীভাবে ইমামতি করতে হয়। তিনি বলেছিলেন, “একজন বয়োবৃদ্ধ লোকের মতো নামায পড় এবং ঈমানদারদের প্রতি বিবেচনাসম্পন্ন হও।”

জনগণের সাথে যোগাযোগ

তুমি কোনক্রমেই নিজেকে জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে নেবে না। তুমি ও তোমার জনগণের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য সৃষ্টিকারী একটা ব্যূহ রচনা করো না ।

এ ধরনের অহংকার হচ্ছে আসলে অন্তঃসারশূন্যতা, দুর্বলতা ও হীনম্নন্যতাবোধের বহিঃপ্রকাশ যা তোমাকে নাগরিকদের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখবে এবং এছাড়াও তোমাকে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার পটভূমি সম্পর্কে অন্ধ করে তুলবে।

ফলে তুমি বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনাবলীর আপেক্ষিক গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হবে এবং ছোট বিষয়কে বড় এবং বড় বিষয়কে ছোট করে দেখা আরম্ভ করবে। এ ছাড়াও তুমি মাঝারি রকমের যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করে গুরুত্বপূর্ণ লোকদেরই উপেক্ষা করতে পার ।

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি দোষ ও গুণের মধ্যকার পার্থক্য বোধ বিস্মৃত হতে পারো, খারাপকে ভালো আর ভালোকে খারাপ মনে করতে পারো কিংবা দুটো গুলিয়ে ফেলতে পারো, ফলে সত্যটা দ্ব্যর্থবোধক হয়ে গিয়ে একটার স্থানে সহজেই অপরটা প্রতিস্থাপন করা হতে পারে ।

আসলে অন্য যে কোন মানুষের মতোই সে একজন মানুষ আর তাই সাধারণ জনগণ যে জিনিসটাকে তুলে ধরতে চায়; এবং অফিসাররা যেটা গোপন রাখতে চেষ্টিত, সে বিষয়টা সম্পর্কে অসচেতন থেকে যেতে পারে ।

এভাবে সত্য মিথ্যার সাথে মিশে একাকার হয়ে যেতে পারে। আর যেহেতু সত্যের কোন আলাদা রং নেই, তাই একে মিথ্যা থেকে কিছুতেই আলাদা করা না-ও সম্ভব হতে পারে ।

সত্যে উপনীত হবার জন্য সত্যকে খুঁজতে হবে এবং কাহিনীর স্তূপ থেকে বাস্তবকে খুঁজে বের করতে হবে। কেবল এভাবেই সত্যকে পাওয়া সম্ভব।

নিজের সম্পর্কে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হও। তুমি কেবল দু’ধরনের শাসকদের শ্রেণীতে পড়তে পারো। সৎ, পরিশ্রমী, আল্লাহভীরু, সাম্য ও ন্যায় নীতির উপর দৃঢ়, সঠিক সময়ে কাজ সম্পাদনকারী, অপরের অধিকারের সংরক্ষক এবং তোমার উপর অর্পিত সমস্ত দায়িত্ব পালনকারী। তাই যদি হয়, তাহলে কেন তুমি নিজেকে জনগণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে আর নিজের চারপাশে বাধার প্রাচীর গড়ে তুলবে ?

অপর শ্রেণীর প্রশাসক কৃপণদের শ্রেণী যারা অপরের অধিকার স্বীকারে অনিচ্ছুক, তাদের অন্তর্ভুক্ত হলেই কেবল তা তুমি করতে পারো। তুমি কি নীচতার শিকার ?

যদি তাই-ই হয়ে থাকে তোমার মনে রাখা উচিত যে, জনগণ তোমার আচরণ ও মনোবৃত্তি জানতে সক্ষম হবে, তারা শুধু প্রথম কয়েক দিনের জন্যই তোমার কাছে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত তোমার কাছে কোন আবেদন বা অনুরোধ নিয়ে আসবে না ।

একথা ভুলে যাবে না যে, তোমার বিবেচনার জন্য পেশ করা তাদের অধিকাংশ আবেদন তাদের স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত নয়। এগুলো হবে জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কিত এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং সততা, ন্যায়নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আবেদন। তাহলে কেন তুমি তাদের অভিযোগ শোনা এড়িয়ে চলবে ?

আত্মীয় ও বন্ধুদের প্রভাব

এটা ভুললে চলবে না যে, মাঝে মাঝে শাসকদেরও আপন আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জন থাকে যারা তাঁকে ঘিরে তাদের সম্পর্কের সুবিধা আদায় করতে চায়। তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা চক্রান্ত, ধোঁকাবাজি, দুর্নীতি ও জুলুমের আশ্রয় নিতে পারে ।

তাদের কাউকে যদি তুমি কাছে দেখতে পাও, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠভাবেই তারা তোমার সাথে সম্পর্কিত হোক না কেন, তাদের তাড়িয়ে দাও। দুষ্কৃতির গোড়া এবং আগা দু’টাই তোমার সমূলে উৎপাটন করে ফেলতে হবে। কোন প্রকার কালক্ষেপণ না করে তোমার আশে-পাশের এসব নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আবর্জনা সাফ করে ফেলতে হবে।

তোমার সমর্থক ও আত্মীয়দেরকে কখনো ভূমির স্থায়ী ইজারা বা মালিকানা প্রদান করবে না। পানির উৎসগুলো এবং সমাজের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় জমিগুলোকে কিছুতেই তাদের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেবে না ।

যদি তারা এ ধরনের সম্পদের অধিকার পেয়ে বসে, স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের প্রতিবেশীদের বা তাদের অংশীদারদের সেচ সুবিধায় হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে তাতে সমস্ত অবৈধ মুনাফা লাভ করে তোমার জন্য এ দুনিয়ার জীবনে দুর্ণাম ও অপমান এবং পরবর্তী জীবনের জন্য শাস্তি বয়ে নিয়ে আসবে ।

যথাযোগ্য ন্যায়বিচার কর। যারা শাস্তির উপযুক্ত তাদের শাস্তি দাও, তারা তোমার আত্মীয়ই হোক বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হোক, তোমাকে অবশ্যই দৃঢ় ও সতর্ক থাকতে হবে, অন্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি তোমার আপন লোকজনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাতে ভ্রূক্ষেপও করো না। এ ধরনের কাজ তোমার জন্যে বেদনাদায়ক হতে পারে। এ ধরনের দুঃখ ও বেদনা সহ্য কর এবং পরবর্তী জগতে যে কল্যাণ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তার প্রত্যাশা করতে থাক। এগুলো কষ্টকর ঠেকতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটাই তোমার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

জনগণের আস্থা

যদি তোমার কড়া পদক্ষেপের কারণে তোমার নাগরিকরা ভুল করে তোমার উপর ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ আনে তাহলে তুমি তাদেরকে কাল বিলম্ব না করে তাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করার জন্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহকারে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করবে, যেন তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এটা একদিকে তোমার মানসিক প্রশান্তি অপর দিকে জনগণের প্রতি আন্তরিক দরদ ও সহানুভূতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। তোমার প্রতি তাদের এ আস্থাবোধই তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে, আর এভাবেই তুমি সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদের সমর্থন লাভের লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে এবং কল্যাণের পথে তাদেরকে পরিচালিত করার জন্য সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তি লাভ করবে।

শান্তি ও সন্ধি

তোমার শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা কোন শান্তির আহ্বানই তুমি প্রত্যাখ্যান করবে না, যদি তা আল্লাহ্র ইচ্ছা ও সন্তোষের পরিপন্থী না হয় ।

এ ধরনের শান্তি বা সন্ধি তোমার সেনাবাহিনীর জন্য বিশ্রাম ও স্বস্তি এনে দেবে, এটা তোমাকে উদ্বেগ ও আশংকা থেকে মুক্ত করবে এবং দেশ ও জনগণের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়ন করবে।

কিন্তু একই সাথে এ ধরনের চুক্তির পর তুমি সব সময় সতর্ক থাকবে এবং তোমার শত্রুদের প্রতিশ্রুতির উপর খুব বেশি আস্থা স্থাপন করবে না। তারা তোমাকে ধোঁকা দিয়ে তাদের প্রতি তোমার অতিরিক্ত আস্থাশীলতার ফায়দা লুটে নেওয়ার চক্রান্ত এঁটে রাখতে পারে ।

অতএব তোমার সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত এবং অতি বিশ্বাস স্থাপন এড়িয়ে চলা উচিত । তা সত্ত্বেও তুমি কখনোই তোমার কথা থেকে ফিরে যাবে না এবং তোমার প্রস্তাবিত সহযোগিতা ও নিরাপত্তা অব্যাহত থাকবে। সন্ধির শর্ত তোমার ভঙ্গ করা উচিত নয় । জীবনের যে কোন হুমকির বিনিময়েও প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করো না, যত কঠিন ঝুঁকিই নিতে হোক না কেন অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিশ্রুতি মেনে চলো ।

মনে রাখবে, আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সমস্ত দায়িত্বের মধ্যে আমাদের প্রতিজ্ঞা পালনের মতো আর কোনটাই এতো গুরুত্বপূর্ণ ও তার নিকট তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্য নয়।

মানুষের মধ্যে আদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও সবাই স্বীকার করে, যে কোন মূল্যেই হোক না কেন প্রতিজ্ঞা অবশ্য পালনীয়।

শুধু মুসলমানরাই নয়, এমন কি কাফেররাও এর মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে অনুধাবন করার কারণে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে তাদের আবশ্যিক কর্তব্য বলে ভাবতো।

সুতরাং তুমি তোমাদের সম্পাদিত সন্ধি, চুক্তি ও প্রতিজ্ঞাসমূহ পালন করার ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান হবে ।

শত্রুপক্ষের প্রতি পূর্বাহ্ণে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ বা চরমপত্র না দিয়ে কখনোই আক্রমণ করতে যাবে না ।

মনে রাখবে, এমন কি শত্রুপক্ষের সাথেও প্রতারণা করার অর্থ আল্লাহ্র সাথেও চাতুরী করা। এর মানে হচ্ছে আল্লাহ্ বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, আর একজন ঘৃণ্য মূর্খ ছাড়া অন্য কেউ এমন গ্লানিময় যুদ্ধে জড়াবে না ।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ প্রতিজ্ঞা, চুক্তি ও সন্ধিকে পবিত্র করে দিয়েছেন, যেহেতু এগুলো মানব জাতির মধ্যে শান্তি আনে। এগুলো হচ্ছে সমস্ত মানুষের সার্বজনীন মতাদর্শ ও সার্বজনীন প্রয়োজনীয়তা।

আল্লাহ্ শান্তিকে প্রত্যেকের জন্যই একটা আশ্রয় ও একটা নিরাপত্তা বানিয়ে দিয়েছেন, তাই চুক্তি বা সন্ধিতে স্বাক্ষর করার সময় কোন মতলব বা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ো না এবং তার মধ্যে নতুন কোন অর্থ খুঁজে আনতে যেও না।

চুক্তির লংঘন

তোমার চুক্তিগুলোতে এমন দ্ব্যর্থবোধক কথা ব্যবহার করো না যার দু’ধরনের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। সন্ধিটি হবে স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট এবং অস্পষ্টতা হতে মুক্ত।

আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা চুক্তির ব্যাপারে তুমি যদি একটি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হও, তাহলে তা পৌরুষের সাথে মুকাবিলা করার চেষ্টা কর, কখনো চুক্তির খেলাফ করো না।

চুক্তির বরখেলাফের মাধ্যমে উভয় জগতেই আল্লাহ্র ক্রোধ ও শাস্তিকে আমন্ত্রণ জানানোর চেয়ে চুক্তি পালন করে ধৈর্যের সাথে সমস্যা ও বিপদের মুকাবিলা করা অনেক ভালো। পরবর্তীতে এটাই তোমার জন্য আল্লাহ্ পুরস্কার নিয়ে আসবে।

রক্তপাত

অহেতুক রক্তপাত ঘটানোর ব্যাপারে সাবধান হও। মনে রাখবে, একটা নির্দোষ ব্যক্তির রক্তপাত ঘটানোর চেয়ে খারাপ আর কিছু নেই। এতে তুমি আল্লাহ্র রহমত থেকে বঞ্চিত হবে, তাঁর শাস্তির পাত্রে পরিণত হবে, তুমি স্বল্পায়ু হবে এবং এভাবে তোমার উপর নেমে আসবে তাঁর রোষানল ।

হাশরের দিন আল্লাহ্ সর্বপ্রথম মানুষ কর্তৃক মানুষের রক্তপাত ঘটানোর হিসাব নেবেন।

সুতরাং তুমি নির্দোষ রক্তপাত ঘটিয়ে তোমার সরকারকে শক্তিশালী এবং তোমার ক্ষমতাকে সুসংহত করতে যেও না। এ ধরনের কাজ তোমার সরকারকে দুর্বল ও ধ্বংস করে দেবে, এমন কি তোমাকে ক্ষমতাচ্যুতও করতে পারে।

যদি তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা কর, তুমি আল্লাহ্র সম্মুখে, আমার বা অন্য কারো কাছে এর কোন কৈফিয়ত দিতে পারবে না। কেননা এ ধরনের অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত জরুরী এবং তা অবশ্যই -মৃত্যুদণ্ড ।

যদি একজন মানুষকে তুমি অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যা কর, কিংবা বিধিসম্মত শাস্তি প্রদানের সময় তোমার চাবুক, তরবারি বা হাত ভুলক্রমে কারুর হত্যার জন্য দায়ী হয়, কিংবা কানের মধ্যে সামান্য একটা শক্তিশালী চড় বা ঘুষিতে কেউ নিহত হয় তাহলে তার উত্তরাধিকারীদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে যত্নবান হও। সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে তোমার পদমর্যাদা যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায় । 

আত্মপ্রশংসা ও আত্মগৌরব

আত্মপ্রশংসা ও আত্মগৌরবকে তোমার অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

তোমার ভালো কাজগুলোর জন্য আপন প্রকৃতির মধ্যে যে অসাধারণ গুণ প্ৰত্যক্ষ কর তার জন্য অহংকার বোধ করো না ।

চাটুকারিতা ও মিথ্যে স্তুতি যেন তোমাকে আত্মাভিমানী করে না তোলে ।

মনে রেখো, তোমার চোখে যেগুলো ভালো ঠেকে সেগুলোর উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং নিজের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রশংসার প্রতি তোমার অনুরাগ শয়তানকে মানুষের মনের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ধার্মিক মানুষের মনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবার একটা সুনিশ্চিত সুযোগ করে দেয়।

এটা অর্জন করা কঠিন যদি না তোমার পালনকর্তার কাছে অবশ্যম্ভাবী প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি তোমার দৃষ্টির সামনে বর্তমান থাকে এবং তাঁর ভয় তোমার প্রত্যেকটা বিবেচনায় প্রাধান্য বিস্তার না করে। দায়িত্ব গ্রহণে তোমার ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তোমাকে এ লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য ব্যাপক সহায়তা দেবে।

অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ

পূর্বতন সরকারগুলো দ্বারা কৃত ন্যায়নীতি ও ইনসাফের ভিত্তিতে করা সুকর্ম, সমাজের কল্যাণে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান, তাদের আইন ইত্যাদি তোমার অবশ্যই মনে রাখতে হবে। পবিত্র কুরআনে বিধৃত আল্লাহ্র আদেশগুলো এবং নবীজীর হাদীসগুলো সব সময় স্মরণ রাখবে। তাঁদের যেভাবে কাজ করতে দেখেছ আর বলতে শুনেছ ঠিক সেভাবে তাদের অনুসরণ করবে।

একইভাবে এ নসীহতনামায় আমি তোমাকে যা শেখাবার প্রয়াস পেয়েছি তা তোমাকে বাস্তবায়ন করতে হবে ।

আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি, যেন তুমি অধঃপাতে না যাও, প্রলোভন থেকে মুক্ত থাকতে পারো এবং সত্যের পথে সুদৃঢ় থাকতে পারো। যদি তুমি বিপথে যাও তাহলে আল্লাহ্ সামনে তুমি কোন ক্ষমা পাবে না ।

পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে এ দোয়া করছি তিনি যেন আমাকে ও তোমাকে তাঁর হিদায়াতের পথে সুদৃঢ় থাকার তৌফিক দান করেন, তাঁর ইচ্ছা ও জনগণের সন্তুষ্টি সাধনই যেন আমাদের যাবতীয় কাজের লক্ষ্য হয়, আমরা যেন ন্যায়ানুগ ইনসাফভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন একটা সুখী ও সমৃদ্ধশীল জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি যা সারা দুনিয়ার মানুষের অনুসরণ যোগে দৃষ্টান্তে পরিণত হয় ।

তাঁর অশেষ দয়া ও রহমত আমাদের উপর বর্ষিত হোক, হে আল্লাহ্, আমাদেরকে শহীদ হবার সৌভাগ্য নসীব করুন; কেননা একমাত্র আপনারই দিকে আমাদের অবশ্য ফিরতে হবে। মহান নবী, তাঁর বংশধর ও অনুসারীদের উপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক ।

ওয়াস সালাম – তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক ।

হযরত আলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চিঠি

দর্শক

কুফা

৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ/৩৭ হিজরী

একজন আল্লাহ্ বান্দা

আলী ইবনে আবূ তালিবের পক্ষ হতে

মিসরের ভাবী গভর্নর

মালিক ইবনে হারিস আশতারের প্রতি

মালিক,

আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ প্রদান করছি, জীবনের সর্ববিধ কাজে আল্লাহ্ এবং তাঁর প্রদত্ত ব্যবস্থাকে সর্বোপরি স্থান প্রদান করবে। তাঁর স্মরণ ও ইবাদতকে অগ্রাধিকার দান করো। কুরআনের নির্দেশ ও নবীর শিক্ষাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অনুসরণ করবে। এ সমস্ত নির্দেশ প্রতিপালনের উপরই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নির্ভরশীল, যারা এসব অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে চিরকালীন অভিশাপ, আল্লাহ্র নির্দেশ পালনে অপারগতার পরিণতি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনেই চরম ব্যর্থতা হয়ে দেখা দেবে। সুতরাং তোমাকে অবশ্যই আল্লাহর প্রদত্ত মূলনীতিগুলোকে মেনে চলতে হবে, আল্লাহর উদ্দেশ্যকে সমর্থন দিতে হবে এবং তাঁর নির্দেশমালাকে সম্মান করতে হবে, কেবল এভাবেই তুমি আল্লাহর সাহায্য, অনুগ্রহ ও রহমতের যোগ্য হতে পার।

আত্মনিয়ন্ত্রণ

আমি তোমাকে আদেশ করছি মালিক, তোমার মনমগজ, হাত ও কণ্ঠ এবং তোমার সমগ্র সত্তা দিয়ে আল্লাহ্কে— তাঁর উদ্দেশ্য ও সৃষ্টিকে সাহায্য করতে । আল্লাহ্ তোমাদের আদেশ করেছেন তোমাদের কামনা ও বাসনাকে নিয়ন্ত্রিত করতে, তোমাদের ‘আত্ম’ ও অহংবোধের রশি টেনে ধরতে, বিশেষ করে যখন তোমাদের কামনার পাগলা ঘোড়া তোমাদের শঠতা ও পাপের দিকে তাড়িয়ে নিতে চায়। তোমাদের ‘আত্মবোধ’ ও তার আকাঙ্ক্ষা তোমাদের প্রতিনিয়ত অধঃপতন ও অবমাননার দিকে প্ররোচিত, উৎসাহিত ও জোর করে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়।

সতর্ক জনগণ

মালিক, আমি তোমাকে এমন একটা দেশের প্রশাসক করে পাঠাচ্ছি, যা অতীতে নীতিহীন ও ন্যায়পরায়ণ, নিপীড়ক ও প্রজাহিতৈষী, নিষ্ঠুর ও হৃদয়বান, অত্যাচারী ও দয়ার্দ্র—এ ধরনের সব সরকারই প্রত্যক্ষ করেছে।

জনগণ পূর্ববর্তী সব শাসন ব্যবস্থাকে যেভাবে নিরিখ করেছে, ঠিক একই রকম সূক্ষ্মভাবে তারা তোমার প্রশাসনকেও বিচার করবে। তুমি পূর্ববর্তী শাসকদের সমালোচনা করছ, যদি তুমি আত্মচেতন না হও তবে তুমি তাদের সম্পর্কে যা বলছ তারাও তোমার সম্পর্কে একই কথা বলবে।

একজন সৎ ও ভালো মানুষের পরিচয় পাওয়া তার সম্পর্কে ভালো কথা যা বলা হয় এবং অপরের কাছ থেকে যে প্রশংসাগুলো আল্লাহ্ তার জন্য নসীব করেন। মনে রেখো, ক্ষমতাসীন লোকদের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার তাদের বংশধরদের দ্বারা তার কৃতকর্মের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

সৎকর্ম

অতএব তুমি তোমার মনকে মহৎ চিন্তা, সদুদ্দেশ্য, সদিচ্ছা ও সৎকর্মের ঝর্ণাধারার উৎসমূল করে তোল । সৎকাজের হিসেব বাড়িয়ে তোলাই যেন হয় সবচেয়ে বড় চিন্তা । এতে তুমি সফল হতে পারো, তোমার কামনা-বাসনাকে লাগামছাড়া হতে না দিয়ে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থেকে।

জেনে রেখো, নিজের প্রতি সুবিচার করবার এবং ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকবার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং অসৎ বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করা।

মালিক, তোমাকে অবশ্যই পছন্দ এবং অপছন্দের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং তোমার মনে জনগণের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহৃদয়তা লালন করতে হবে। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত তোমার সাফল্যই নির্ভর করছে তাদেরকে নির্যাতন ও নিষ্পেষণের উপর—এমনভাবে তুমি তাদের সাথে ব্যবহার করবে না।

অমুসলিমদের প্রতি আচরণ

মনে রাখবে মালিক, জনগণের মধ্যে দু’ধরনের লোক রয়েছে—এক হচ্ছে তোমার ঈমানী ভাই এবং অন্যেরা হচ্ছে অন্য ধর্মে বিশ্বাসী—কিন্তু তারা তোমারই মত মানুষ । উভয় প্রকার মানুষই সাধারণ মানবীয় অক্ষমতা ও দুর্বলতার শিকার।

জেনে কিংবা না জেনে তারা অপরাধ করে থাকে এবং তাদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন হয়ে তারা পাপ কাজে লিপ্ত হয় ।

তোমার প্রতি আল্লাহর যে রকম দয়া ও সহানুভূতির আশা কর তাদের প্রতিও তুমি তেমন দয়ার্দ্র ও সহানুভূতিশীল হও।

তোমাকে তাদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। তোমার ভুলে গেলে চলবে না যে, তোমার উপরে তোমার খলীফা রয়েছেন, আর তোমার খলীফার উপর রয়েছেন আল্লাহ।

আল্লাহ্ তোমাকে গভর্নর বানিয়েছেন, তোমার উপর জনগণের দেখাশোনার ভার দিয়েছেন এবং তিনি তাদের মাধ্যমে তোমাকে পরীক্ষা করতে চান।

নিজেকে কখনো এমন পর্যায়ে উন্নীত করার কথা ভেবো না, যাতে করে আল্লাহর সাথে দ্বন্দ্বের—তথা তোমার আত্মাকে ধ্বংস করবার আশংকা রয়েছে। তাঁর শাস্তি থেকে রেহাই পাবার শক্তি তোমাদের নেই আর তাঁর ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ ও সহানুভূতি ছাড়া তোমার চলা সম্ভব নয়।

সহমর্মিতা ও অনুকম্পা

ক্ষমা ও অনুকম্পা প্রদর্শন করতে কখনো লজ্জা কিংবা বেদনা বোধ করো না । কাউকে শাস্তি দেবার ক্ষমতা আছে বলে কখনো পুলকিত বা গর্ব বোধ করো না ।

অধীনস্থদের ব্যর্থতায় ক্রোধান্বিত হয়ো না। অধস্তন কর্মচারীদের ভুলের প্রতি রাগান্বিত কিংবা অধৈর্য হয়ো না। তাদের প্রতি সহনশীল ও সহানুভূতিসম্পন্ন হও। প্রশাসনে ক্রোধ কিংবা প্রতিশোধের ইচ্ছা কোন কাজেই আসবে না ।

মানুষকে এ কথা মনে করিয়ে দিতে যেও না যে, তুমি গভর্নর, অশেষ ক্ষমতাধর এবং প্রত্যেককে অবশ্যই তোমার প্রতি বিনীত, আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে এবং তোমাকে মেনে চলতে হবে। এ ধরনের আত্মম্ভরিতা তোমার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করবে, দাম্ভিক করে তুলবে, ঈমান দুর্বল করবে এবং তোমাকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য শক্তির সাহায্য কামনা করতে বাধ্য করবে।

গর্ব ও ঔদ্ধত্য

যদি তোমার মনে কখনো অহমিকা স্থান পায়, সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ কর তোমার উপর আল্লাহর মহান শক্তি ও ক্ষমতা-প্রভাবের কথা, তাঁর সৃষ্টির বিশালত্ব, এমন কি তোমার একান্ত ঘনিষ্ঠ ব্যাপারেও তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং তোমার ক্ষমতার বাইরে যেখানে তোমার শক্তি একেবারেই ক্ষীণ সেখানেও তাঁর কর্তৃত্বের প্রতি চিত্তকে নিবিষ্ট করবে। এ ধরনের ধ্যান তোমার অহংবোধে আঘাত হানবে, তোমাকে আত্মম্ভরিতা ও বিদ্রোহ থেকে দূরে রাখবে, তোমার ঔদ্ধত্যকে বিনাশ করবে এবং তোমার হারানো সুস্থতা ফিরিয়ে আনবে।

সাবধান ! কখনো ক্ষমতার দিক থেকে সমকক্ষতা দাবি কিংবা গৌরব, মহত্ত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে প্রতিযোগিতা করার কথা চিন্তাও করো না, কেননা আল্লাহ্ পাপী ও নিপীড়কদের নত করে দেন এবং যারা তাঁর মত ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী হবার ভান করে, তাদের অপদস্থ করেন।

সাম্য ও ন্যায়বিচার

তোমার উপর আল্লাহ্ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব প্রতিপালনের জন্য কষ্ট স্বীকার কর । মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নিও না। একদিকে আল্লাহ্ ও সাধারণ মানুষ এবং অন্যপক্ষে তোমার আপন আত্মীয়, বন্ধু ও প্রিয়জন সম্পর্কিত বিষয়ে সতর্ক থেকো।

মনে রেখো, যদি তুমি সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে কাজ করতে ব্যর্থ হও তাহলে অত্যাচারী ও নিপীড়ক বলে পরিগণিত হবে, যে আল্লাহর সৃষ্টিগুলোর প্রতি অবিচার করে, সে আল্লাহকে নিজের বৈরী করে ফেলে এবং মজলুমের ঘৃণা অর্জন করে । আল্লাহ্ যার বিরুদ্ধে চলে যান এবং যার প্রতি অসন্তুষ্ট হন তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে অনুতপ্ত হয়, আল্লাহ্ তার বৈরী থেকে যান ।

মনে রাখবে মালিক, এ বিশ্বে আল্লাহর রহমত থেকে কাউকে বঞ্চিত রেখে আল্লাহর রোষ আমন্ত্রণ করার মতো অপরাধ আর কিছু নেই। তাঁর সৃষ্টির উপর জুলুম ও নিপীড়নের চেয়ে আর কিছুতেই আল্লাহ্ তা’আলা রোষাগ্নি প্রজ্বলিত করেন না। তিনি সব সময় মজলুমের দো’আ শুনে থাকেন এবং সর্বক্ষণ শাস্তি দেওয়ার জন্য জালিমদের খোঁজ করেন।

সাধারণ মানুষ ও সুবিধাভোগী শ্রেণী

খুব মিঠেও নয় খুব কড়াও নয় বরং সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক একটা নীতি তোমার গ্রহণ করা উচিত, এমন একটা নীতি বহুল প্রশংসিত হবে।

গুটি কয়েক সুবিধাভোগী লোকের সমর্থন ও সন্তুষ্টির চেয়ে তুমি সাধারণ ও নিপীড়িত জনগণের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হবে ।

যদি সাধারণ জনগণ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে তবে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর অসন্তোষ তোমার প্রভুর কাছে গুরুত্ব লাভ করবে না।

আসলে একটা সরকারের স্থায়িত্বই জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল

তুমি মনে রাখবে মালিক, এ মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী শ্রেণী হচ্ছে মানব সমাজের আবর্জনা। তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা (১) সমৃদ্ধির সময় রাষ্ট্রের উপর সবচেয়ে বড় বোঝা, (২) অভাব ও সংকটের সময় তারা সবচেয়ে কম উপকারী, (৩) তারা সাম্য ও ন্যায়কে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, (৪) রাষ্ট্রীয় সম্পদে তাদের দাবির ব্যাপারে তারা সবচেয়ে নাছোড়বান্দা, (৫) তারা কখনোই প্রদত্ত অনুগ্রহে তৃপ্ত নয়, (৬) সমস্ত অনুগ্রহের ব্যাপারেই তারা সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ, (৭) যখন তাদের দাবিগুলো যথার্থভাবেই অগ্রাহ্য করা হয়, তখন তারা এর পেছনে যুক্তিগুলো মেনে নিতে সবচেয়ে নিস্পৃহ ও অনাগ্রহী, (৮) আর যখন সময় ও ভাগ্য পরিবর্তিত হয়, তাদেরকে তখন তাদের বিশ্বাসের উপর মোটেও স্থির থাকতে দেখা যায় না, এ সমাজের সম্পদগুলোর জন্যে তারা হচ্ছে সবচেয়ে বড় নর্দমা।

এ সমস্ত লোকের বিপরীত সাধারণ মানুষ, দরিদ্র ও কম সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী হচ্ছে ইসলামের খুঁটি। তারা হচ্ছে মুসলিম সমাজের আসল শক্তি। ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তারা সদা সতর্ক সৈনিক হিসেবে কাজ করে। সুতরাং তাদের প্রতি তোমার মনের দুয়ার খুলে দাও, তাদের সাথে আরো বন্ধুভাবাপন্ন হও এবং তাদের সহানুভূতি ও আস্থা অর্জন কর।

নিন্দুক, খয়ের খাঁ ও রটনাকারীদের পরিহার

গুরুত্বপূর্ণ বা সাধারণ মানুষ যে-ই হোক, তার সাথে সাক্ষাৎ ও বন্ধুত্বের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর ।

ধামাধরা ও খয়ের খাঁদের থেকে দূরে থাকবে, যারা অপরের খুঁত খোঁজে আর কুৎসা রটনাতে নিয়োজিত তাদেরকে শত্রু বলে মনে করবে।

এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, মানুষের মধ্যে দোষত্রুটি ও দুর্বলতা থাকবে । মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয় । এ সবকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার একজন শাসকের চেয়ে আর কার বেশি থাকতে পারে ?

স্মরণ রেখো, একজন নিন্দুক অত্যন্ত হীন প্রকৃতির ও বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন লোকসে তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও একনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে দেখাতে চাইলেও আসলে সে অত্যন্ত নীচ ও শঠ। তাদের উপদেশ নেওয়ার ব্যাপারে ধীরস্থির বিবেচনা প্রয়োজন ।

ভুলত্রুটিগুলো উপেক্ষা কর

অতএব তুমি অবশ্যই গোপন ভুলক্রটিগুলো অনুসন্ধান করতে যাবে না । ওগুলো আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। দৃশ্যমান ত্রুটি ও ব্যর্থতাগুলোর ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব হচ্ছে, কি করে সেগুলো সংশোধন করতে হয় সে ব্যাপারে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া ।

কখনো অপরের ভুল ফাঁস করে দেবার চেষ্টা করো না। প্রতিদানে তুমি যে ভুলটা মানুষের কাছে গোপন রাখতে চাও আল্লাহ্ তা ঢেকে রাখতে পারেন ।

বিশ্বাসভাজন ও টাউট

তোমার জনগণের মধ্য থেকে হিংসা দূর করার চেষ্টা কর। মানুষের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়িও না। অ-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করে যাও। তোমার অনুগ্রহ বণ্টন ও আস্থা স্থাপন যেন মানুষের মধ্যে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি না করে । প্রত্যেকের ব্যাপারেই সৎ ও নিরপেক্ষ হও। তোমার ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও অনুগ্রহ যেন হিংসা ও বিদ্বেষ উদ্রেকের উৎস না হয়; যে ব্যক্তি তোমার নৈকট্য ও আনুকূল্য পাবার যোগ্য নয়, সে যেন তোমার কাছে আসতে না পারে। কখনো তোমার সম্মান ও মর্যাদা নীচু করবে না ।

উপদেষ্টা

কৃপণদের থেকে কখনো উপদেশ গ্রহণ করবে না—যারা তোমাকে ঔদার্যপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং তোমার মধ্যে দারিদ্র্যের ভীতি সৃষ্টি করবে ।

একইভাবে ভীতু ও কাপুরুষদেরও উপদেষ্টা বানিও না। যেহেতু তারা সব সময়ই তোমার দায়িত্ব পালনে নিরুৎসাহী করবে এবং আদেশ-নির্দেশ প্রদান ও কার্যকরী করার ব্যাপারে দুর্বল করে তুলবে।

তারা তোমার ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করবে, তোমাকে দুর্বলচিত্ত করে দেবে এবং যে সমস্ত বিষয়ে সাহসের প্রয়োজন সেই সব বিষয়ে তোমাকে ভীরু করে তুলবে। লোভী ও অর্থগৃধুদেরও তোমার উপদেশদাতা বানিও না, কেননা তারা তোমাকে শোষণের পরামর্শ দেবে, তোমাকে লোভী করে তুলবে, দুর্নীতিকে খাঁটি অপরাধ বানিয়ে দেবে এবং অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর জন্য তোমাকে প্রভাবিত করবে।

তুমি ভুলে যাবে না যে, কৃপণতা, কাপুরুষতা ও লোভ ভিন্ন প্রকৃতির বলে মনে হতে পারে যদিও এগুলো সব সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাসহীনতার কু-প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত ।

উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের নির্বাচন

তোমার নিকৃষ্টতম মন্ত্রণাদাতারা হবে তারা, যারা তোমার পূর্ববর্তী শোষক ও নিপীড়কদের মন্ত্রী/উপদেষ্টা/মন্ত্রণাদাতা থেকে তাদের অন্যায়, অপরাধ ও নৃশংসতার সহযোগী ছিল ।

প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার দিক থেকে তাদের সমমানের ব্যক্তি তুমি সহজেই পেতে পার। অথচ তাদের মত তারা তাদের ঘাড়ে সেই পাপের বোঝা বহন করে না। তারা সেই ব্যক্তি যারা কখনো কোন নিপীড়ককে সাহায্য সহযোগিতা করে নি।

এ সমস্ত লোকই সবচেয়ে কম ক্ষতিকর এবং সবচেয়ে বড় সহযোগী প্রমাণিত হবে।

যদি তুমি তাদেরকে কাছে টেনে নাও, তবে তারা, তাদের সাথে যদি শত্রুপক্ষের কোন সম্পর্ক থাকে তার সাথে, সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এ সমস্ত লোককে ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় কাজে তোমার সাথী বানাও ।

শুধু ঐ সমস্ত ব্যক্তির উপর তোমার আস্থা স্থাপন কর, যারা তোমার সমালোচনায় সবচেয়ে স্পষ্ট এবং যারা তোমার পদমর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতি যে কোন ধরনের ভীতি ছাড়াই যে কোন অপ্রিয় সত্য কথা বলবে। যে সমস্ত কাজ তোমার পছন্দসই হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় তারা সে সমস্ত কাজে তোমাদেরকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানাবে ।

চাটুকারদের সঙ্গ এড়িয়ে চলা

রাষ্ট্রীয় কাজে সত্যনিষ্ঠা, ধর্মপ্রাণ ও সৎ লোকদের সংগ্রহ করে তাদেরকে তুমি যে সমস্ত কাজ করনি সে সমস্ত কাজের কৃতিত্ব তোমার উপর চাপিয়ে তোষামোদ করার প্রবণতা বন্ধ করার জন্য প্রশিক্ষণ দাও।

যারা মিথ্যা প্রশংসা করে আনুকূল্য চায় তাদের ত্যাগ কর। তোষামোদ ও মিথ্যা প্রশংসা তোমাকে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মগর্বিত করে তুলবে এবং তোমার মধ্যকার প্রকৃত মানুষটিকে অন্ধ করে তোমাকে করে তুলবে গর্বোদ্ধত।

ভালো ও মন্দের পার্থক্য

ভালো আর মন্দের সাথে তুমি একই রকম আচরণ করবে না। এটা যদি তুমি কর তাহলে তুমি ভালো মানুষকে ভালো কাজ থেকে দূরে সরিয়ে ফেলবে এবং দুষ্কৃতকারীদেরকে কুকর্মে উৎসাহ দেওয়া হবে। সুতরাং যে যে রকম কাজ করে, তোমার কাছ থেকে তার সে রকম আচরণই লাভ করা উচিত।

আস্থাভাজন হও

তোমার মনে রাখা প্রয়োজন, একজন শাসক জনগণের মধ্যে আনুগত্য ও সুনাম ক্রমাগত সৃষ্টি করতে পারে, শুধু যদি সে তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও সহানুভূতিসম্পন্ন হয়, তাদের বোঝা হাল্‌কা করে দেয়, তাদের ক্ষমতার বাইরে কর বসানো পরিহার করে, তাদের উপর জুলুম ও নিষ্পেষণ না চালায়, তাদের শক্তির বাইরে কোন দায়িত্ব না চাপিয়ে দেয়।

সুতরাং তোমার কাজ ও আচরণ এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে তুমি তাদের আস্থা অর্জন করতে পার । এমন কিছু করবে না যাতে তুমি তাদের অবিশ্বাসের কারণ হয়ে ওঠো। তোমার উপর তাদের আস্থা, তোমার উদ্বেগ ও আশংকা বহুলাংশে কমিয়ে দেবে।

এমন সব লোকের উপর তোমার আস্থা স্থাপন করা উচিত যাদেরকে তুমি বিচার ও পরীক্ষা করার পর বন্ধু বানিয়েছ এবং আস্থা স্থাপন করেছ।

এমন সব লোকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না যারা নিজেদেরকে অবিশ্বস্ত, অদক্ষ ও অযোগ্য প্রমাণ করেছে এবং যারা অন্যায়ভাবে মনে করে যে, তুমি তাদের প্রতি নির্দয় ও রুক্ষ ব্যবহার করেছ।

ভালো ঐতিহ্যের সংরক্ষণ

কল্যাণকর ঐতিহ্য, রীতি ও আচার-ব্যবহার এবং পূর্ববর্তী প্রশাসন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আইন-কানুন ও রীতি যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও সৌহার্দ্যবোধ দৃঢ় হতো সেগুলো তুমি ভেঙে দিও না বা পরিবর্তন করো না ।

মনে রেখো, এ সমস্ত মহৎ ঐতিহ্য ও রীতির উপরেই জনগণের মধ্যে শান্তি ও সুনাম নির্ভর করবে।

এমন কোন অভিনব কিছুর প্রচলন করো না যা কোন কল্যাণকর প্রাচীন ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যারা এ সমস্ত অভিনব রীতি চালু করেছে তারা তার জন্য প্রতিদান লাভ করবে; কিন্তু পূর্বতন কল্যাণকর ঐতিহ্য ভঙ্গের জন্য লাভ করবে শাস্তি ।

বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার স্বাধীনতা

তোমার জানতে হবে মালিক, তোমাকে যে জনগণের উপর শাসক নিযুক্ত করা হয়েছে, তারা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রত্যেক শ্রেণীর সমৃদ্ধিই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে এতখানি পরস্পর নির্ভরশীল যে, গোটা সমাজ কাঠামোটাই যেন একটা ঘনভাবে বোনা জাল । অপর অংশের কার্যকর সহযোগিতা ও সদিচ্ছা ছাড়া কোন একটা দলই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে না।

তাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য আল্লাহ্ সেনাবাহিনী, পরবর্তী শ্রেণী হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সচিবরা, তৃতীয় দলটি হচ্ছে বিচার কাজ নিশ্চিতকরণের কাজে নিয়োজিত কাযী ও ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ। চতুর্থ দলটি হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে যাঁরা দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেন। তারপর আসছে সাধারণ মানুষ– মুসলমান যারা সরকারী কর প্রদান করে এবং অমুসলিম যারা করের বদলে জিযিয়া কর দেয়। তারপর আসছে সমাজের পাদ প্রদেশের দোকানদার, শিল্পী ও কারিগর, যাদেরকে তুমি দরিদ্র ও নির্যাতিত দেখতে পাবে ।

এ সব প্রত্যেকটা শ্রেণীর অধিকার ও কর্তব্য রাহমানুর রাহীম আল্লাহ্ তাঁর কালামে পাকে ব্যাখ্যা করেছেন এবং রাসূলের হাদীসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন, এর একটা সম্পূর্ণ নমুনা আমাদের সাথে মজুদ রয়েছে।

সেনাবাহিনী

আল্লাহর আদেশে সেনাবাহিনী ও পুলিশ রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় একটা দুর্জয় দুর্গের ভূমিকা পালন করে। তারা একজন শাসকের জন্য অলংকার, তারা একটা শক্তির উৎস, ঈমানদারদের মর্যাদা ও শান্তি ।

যারা মানুষের মধ্যে শান্তি নিশ্চিত করে, তারা হচ্ছে নিরাপত্তার অভিভাবক যাদের মাধ্যমে দক্ষ অভ্যন্তরীণ প্রশাসন সুনিশ্চিত হতে পারে ।

জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা তাদেরকে ছাড়া রক্ষা করা অসম্ভব ।

সেনাবাহিনীর সংরক্ষণ তাদের জন্য আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত করের উপর নির্ভরশীল। এই কর দিয়ে তারা নিজেদের ভরণ-পোষণ, অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো এবং ঈমান ও ন্যায়ের পথে সংগ্রামে শত্রুদের পরাভূত করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সদা প্রস্তুত থাকে । 

বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও সচিবালয়

যদিও জনগণ ও সেনাবাহিনী দু‘টো গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী, তাদের স্বাচ্ছন্দ্য অন্যান্য শ্রেণীর; যথা—বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও সচিবালয়ের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব । প্রথমটি বিচার চালায়, দ্বিতীয়টি রাজস্ব সংগ্রহ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে এবং তৃতীয় দলটি তাদের সাধারণ কল্যাণ ও বিশেষ বিষয়াবলী বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অধিকার ও দায়িত্বের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করে।

ব্যবসায়ী ও কারিগর

উপরিউক্ত কাঠামোর কল্যাণ নির্ভর করে আবার ব্যবসায়ী, শিল্পী ও কারিগরদের উপর। তারা সরবরাহকারী ও ভক্তদের মধ্যে মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করে। তারা লাভের আশায় দোকান, বাজার ও ব্যবসা কেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপন করে। কারিগররা তাদের নির্মাণ কার্য দিয়ে সমাজকে এমনভাবে সাহায্য করে, যা অদক্ষ শ্রম দিয়ে সম্ভব নয়।

দরিদ্র ও পঙ্গু

দরিদ্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম শ্রেণী হচ্ছে পঙ্গু, দরিদ্র ও ছিন্নমূল গোষ্ঠী। তারা অন্যান্য মানুষের নিকট থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা পাবার যোগ্য ।

এই শ্রেণীভুক্ত প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জীবন নির্বাহের জন্য আল্লাহ্ বহু কিছু দিয়েছেন প্রত্যেক গোষ্ঠীরই অধিকার রয়েছে একটা সুখী জীবনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বস্তু রাষ্ট্র থেকে পাবার ।

মনে রাখবে, আল্লাহ্ কোন শাসককেই তার দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে অব্যাহতি দেবেন না, যদি সে তার দায়িত্ব পালনে যথাসাধ্য প্রয়াস না পায় এবং ন্যায় ও সত্যের পথ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ না করে এবং মানুষের প্রতিক্রিয়া অনুকূল বা প্রতিকূল যা-ই হোক না কেন, এ সবই সে ধীরস্থিরভাবে সয়ে নেয় ।

সেনাবাহিনীর সেনাপতিবৃন্দ

এমন কাউকে সেনাপতি নিয়োগ করবে, যে তোমার মতে সবচেয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্, নবীজী ও তোমার ইমামের প্রতি নিবেদিত, যাঁর একটা স্বচ্ছ বিবেক রয়েছে, যাঁর ধার্মিকতা, জ্ঞান ও ভদ্র আচরণের জন্য খ্যাতি রয়েছে, যিনি হঠাৎ রেগে যান না, অজুহাতকে সহৃদয়তার সাথে বিবেচনা করে থাকেন, যিনি সবলদের প্রতি শক্তি প্রয়োগ, কঠোরতা ও দুর্বলদের প্রতি দয়ার্দ্র চিত্ত ও মহানুভবতা প্রদর্শন করে থাকেন, যিনি হবেন প্রতিশোধপরায়ণতা ও জিঘাংসার মনোভাব হতে মুক্ত যা মানুষকে শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করে। হীনম্মন্যতা হতে তাকে মুক্ত হতে হবে যা তার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে মানুষকে অসহায় করে তোলে। ভালো সেনাধ্যক্ষ বাছাই ও যোগ্য অফিসার নিয়োগের জন্য তোমাকে এমন সব লোকের সঙ্গে মিশতে হবে ও সম্পর্ক রাখতে হবে, যারা বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে উন্নত এবং যারা ধার্মিকতা, সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় বীরত্বপূর্ণ কাজের সুমহান ঐতিহ্যের অধিকারী। সাধারণত এসব লোকই সর্বোত্তম চরিত্রের ধার্মিকতার আদর্শ ও মহান কার্যাবলীর প্রেরণা প্রদানকারী উৎস হিসাবে পরিগণিত হতে থাকবে, এভাবে বাছাইকৃত লোকদের কাজকর্মের প্রতি পিতৃসুলভ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে যাতে তাদের কোন দোষত্রুটি অতি সহজে তোমার নিকট ধরা পড়ে। তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং এতে তোমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও আস্থাশীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে ।

যে সব প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদেরকে শক্তিশালী করা হয়েছে সুবিবেচনার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অতিরঞ্জিত করো না। তাদের ছোটখাট অভাব পূরণে উদাসীনতা প্রদর্শন করো না। যদিও প্রধান প্রয়োজনাদি পূরণ করাটা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ, তথাপি অনেক সময় ছোটখাট প্রয়োজনের প্রতি নজর প্রদান ও অনুগ্রহ প্রদর্শন অত্যধিক ফলপ্রসূ হয়ে থাকে । তাদের বড় বড় বিষয়ের প্রতি যথাযথ নজর প্রদান করা হয়েছে একমাত্র এ অজুহাতে ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোকে খাটো করো না ।

সেনাবাহিনীর অফিসারবৃন্দ

যেসব সামরিক কর্মকর্তা তাদের শত্রুসৈন্য ছাড়া অন্য সব অধীনস্থ সৈনিকের সর্ব প্রকারের দুঃখ-দুর্দশা দূরীকরণে অত্যধিক মনোযোগী ও তৎপরতা প্রদর্শন করে থাকে, তারাই সামরিক সম্মান ও বিবেচনার যোগ্য বিবেচিত হবে। এসব অফিসার তাদের সৈনিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুখশান্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সহায়-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করে থাকেন যেন পরিবার ও সন্তান-সন্ততির চিন্তামুক্ত হয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে জীবন যাপন করতে পারে। এমনই ভাবে তুমি তাদের অন্তরকে জয় করে নেবে। তারা সর্ববিধ চিন্তাভাবনামুক্ত মন নিয়ে সাহসিকতা ও পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে যুদ্ধ করে যাবে। তোমার অফিসার ও সৈনিকদের প্রতি সদা যত্নবান থাকার কারণে তারাও তোমাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালবাসতে থাকবে ।

ন্যায়নীতি, সুবিচার ও ইনসাফ

একজন শাসকের জন্য এটাই সবচাইতে একমাত্র বড় আনন্দ ও তৃপ্তি যে, তাঁর দেশ ন্যায়নীতি, সুবিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং শাসকের প্রতি নাগরিকদের মনে আস্থা ও ভালবাসার মনোভাব বিরাজ করছে।

তোমার লোকেরা তোমাকে কিছুতেই ভালবাসতে পারে না যদি তারা অসুখী থাকে এবং তুমি তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হও। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমার শাসনকে অবাঞ্ছিত ও বোঝা মনে করতে থাকবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য এগিয়ে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার কিছুতেই মনে করা উচিত হবে না যে, তারা তোমার শাসনের সমর্থক। তোমার সরকারের তারা ধ্বংস চাইবে না, যদি না তাদের কাছে তোমার সরকার অসহ্য বোঝার মত হয়ে ওঠে। 

সুতরাং তোমার কাছে তারা যা সঙ্গতভাবে আশা করে তুমি তা তাড়াতাড়ি পূরণ করার ব্যবস্থা করো ।

ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান

যারা প্রশংসাযোগ্য তাদের প্রশংসার ব্যাপারে উদার হও, তাদের ভালো কাজকে উৎসাহ দাও, আর সাহসী লোকদের মহৎ সাফল্যের ব্যাপক প্রচারণা দাও ।

ভালো কাজের ব্যাপক প্রচারণা সাহসীদের মধ্যে জাগাবে আরো বেশি উৎসাহ আর ভীরু ও কাপুরুষদের করে তুলবে সাহসী।

আবার কে কি করেছে সে বিষয়ে তোমার ভালোভাবে জানা থাকতে হবে, যাতে একজনের কৃতিত্ব আরেকজনের কাঁধে চাপানো না হয় ।

যে তার ভালো কাজের জন্য যথার্থভাবেই যোগ্য তার অবমূল্যায়ন কিংবা পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য করো না ।

এভাবেই একটা কাজকে তোমার অতি মূল্যায়ন করাও উচিত নয় শুধু এ কারণে যে, সেটা করেছেন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তার অবস্থান ও মর্যাদা তার কাজের গুরুত্বকে বাড়িয়ে তোলার জন্য তোমাকে যেন প্রভাবিত না করে। একই সাথে একজন সাধারণ মানুষের করা মহৎ কাজকে উপেক্ষা করো না। সাম্য, ন্যায় ও সততা যেন তোমার মূল উদ্দেশ্য হয় ।

আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা

যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, অনিশ্চয়তা তোমার মনের একাগ্রতাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, তুমি তখন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আশ্রয় নেবে।

যাদেরকে আল্লাহ্ সঠিক পথ দেখাতে চান তাদেরকে এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং যারা তোমাদের মধ্যে কর্তৃত্বশীল তাদের আনুগত্য কর, আর তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিষয়ে বিবাদ উপস্থিত হয় তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের হাতে ছেড়ে দাও।”

আল্লাহর হাতে কোন বিষয় ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাঁর কালাম থেকে নির্দেশনা ও উপদেশ খোঁজা আর নবীর হাতে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাঁর এমন সব হাদীস অনুসরণ করা যেগুলো সন্দেহের ঊর্ধ্বে।

বিচার বিভাগ

জনগণের বিচার কাজ চালানোর জন্য তোমাকে সুবিবেচক হতে হবে ।

এ উদ্দেশ্যে উন্নত চরিত্র, মেধাবী, উঁচু মনের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নির্বাচন করা উচিত।

তাদের অবশ্যই নিম্নরূপ গুণাবলীসম্পন্ন হতে হবে :

১. সমস্যার জটিলতা কিংবা সংখ্যার আধিক্যের কারণে তাদের কখনোই মেজাজের ভারসাম্য হারানো উচিত নয়।

২. যখন তারা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, তার প্রদত্ত রায় ভুল হয়েছে তা সংশোধন করা কিংবা সে রায় বদলে দেওয়া তাদের পক্ষে মোটেও মর্যাদাহানিকর ভাবা উচিত নয় ।

৩. তারা লোভী, দুর্নীতিপরায়ণ ও চরিত্রহীন হতে পারবে না ।

৪. যতক্ষণ পর্যন্ত না একটা অভিযোগের এদিক ও সেদিক আগাগোড়া যাচাই করে না দেখা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিশ্চিত হওয়া অনুচিত, যখন অস্পষ্টতা ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তখন আরো বিস্তৃত অনুসন্ধান চালিয়ে বিষয়গুলো স্পষ্ট করে নিয়ে তারপর রায় দিতে হবে।

৫. তাদের অবশ্যই যুক্তি-প্রমাণের উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং তাদের কখনোই মামলাকারীর দীর্ঘ কৈফিয়ত শোনবার ব্যাপারে অধৈর্য হলে চলবে না। বিশদ বিবরণের সূক্ষ্ম নিরীক্ষণে এবং বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের মাধ্যমে মিথ্যা থেকে সত্যে উপনীত হবার কাজে অবশ্যই ধীরস্থির এবং অধ্যবসায়ী হতে হবে। আর এভাবে যখন সত্য আবিষ্কৃত হবে, তখন তাদের নির্ভয়ে রায় প্রকাশ করে বিবাদের ইতি টানতে হবে।

৬. যাদের প্রশংসা করা হলে আত্মদর্শী হয়ে ওঠে এবং যারা তোষামোদে গলে যায় আর

চাটুকারিতা ও প্ররোচনায় বিপথগামী হয় তাদের মধ্যে যেন কেউ বিচারক না হয় ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ সমস্ত গুণসম্পন্ন লোক খুব কমই দেখা যাবে। যখন তুমি বিচারক নিয়োগ করবে, তাদের কিছু কিছু বিচারের রায় ও ধারা বিবরণী তুমি আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবে। সাথে সাথে তুমি তাদের জন্য একটা ভালো পরিমাপের ভাতা নির্ধারণ করে দিও, যাতে তাদের সমস্ত বৈধ প্রয়োজনগুলো মিটে যায় আর তারা যেন অপরের থেকে চাইতে কিংবা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয়।

তোমার সরকারের মধ্যে তাদেরকে এমন একটা মর্যাদা ও সম্মান এবং তোমার ঘনিষ্ঠতা নিশ্চিত করবে, যেন তোমার কোন অফিসার বা সভাসদ কেউই তাঁদেরকে ভীত কিংবা তাঁদের উপর কর্তৃত্ব না করতে পারে ।

বিচার বিভাগকে অবশ্যই সব ধরনের প্রশাসনিক চাপ ও প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হবে, ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, একে অবশ্যই ভীতি ও পক্ষপাতহীন হয়ে কাজ করে যেতে হবে।

বিষয়টা ভাল করে ভেবে দেখ আর বিশেষত এ দিকটার উপর গুরুত্ব দাও, কারণ তোমার নিযুক্তির আগে এ রাষ্ট্রটা দুর্নীতিপরায়ণ ও দাগাবাজদের অধীনে ছিল। এসব লোভী ও জঘন্য ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রটাকে শোষণ করেছে এবং সম্পদ অর্জন এবং অন্যান্য পার্থিব বস্তু অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসকবৃন্দ

রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা প্রশাসকবৃন্দের কাজকর্ম দেখাশোনার দায়িত্ব তোমার, তাদের চরিত্র, যোগ্যতা ও আচরণ ভাল করে পরীক্ষা করার পর তাদেরকে নিযুক্ত করা উচিত। পরীক্ষার ভিত্তিতে এবং কোন ধরনের পক্ষপাত ও অপরের প্রভাবমুক্ত থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া উচিত।

যদি তুমি অফিসারদের নিছক প্রতিপালন ও সাহায্য করার উদ্দেশ্যে নিয়োগ করে থাক তাহলে তা অবিচার, অত্যাচার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার ও দুর্নীতির রূপ পরিগ্রহ করবে। অভিজাত বংশীয়, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও প্রাথমিক যুগে যারা ইসলামের জন্য আত্মত্যাগ করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমার কর্মকর্তা নিয়োগ কর। উন্নত চরিত্র ও অত্যন্ত ভদ্র ও শরীফ হলে তারা সহজেই লোভ ও দুর্নীতির শিকার হয়ে পড়বে না, যেহেতু তারা তাদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে অসচেতন নয় ।

তাদেরকে ভালো বেতন দিও, যেন তারা নৈতিক অধঃপতনের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, এটা তাদের নিজেদের উপর আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং তারা যে তহবিলের জিম্মাদার তার উপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ করবে। মোটা ভাতা পাবার পরও যদি তারা তহবিল তসরুপ করে আর নিজেদেরকে অসাধু প্রমাণ করে তাহলে তুমি তাদেরকে শাস্তি দেবার জন্য একটা সংগত কারণ পাবে। সুতরাং তাদের কাজের পদ্ধতি ও খুঁটিনাটির উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবে এবং তাদের নিযুক্তির পর স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে রাখবে না ।

এ সমস্ত কর্মকর্তার কাজ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য তোমার সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ করা উচিত, যদি তারা জানে যে, তাদের কার্যাবলী গোপনে দেখা হচ্ছে তাহলে তারা অসাধুতা ও অসৎকর্ম থেকে বিরত থাকবে।

জনগণের প্রতি আন্তরিকতাপূর্ণভাবে নিবেদিত হও এবং তোমার সরকারকে অসাধু কর্মকর্তাদের অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা কর। এরপরও যদি তুমি কোন অফিসারকে অসৎ দেখতে পাও এবং তোমার গুপ্তচররাও যদি তার সমর্থন দেয় তাহলে তুমি অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ করবে।

শাস্তিটা হতে পারে শারীরিক, চাকুরী থেকে বরখাস্তকরণ এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান, তাকে এমনভাবে অপদস্থ করতে হবে যেন সে তার কৃত অপরাধের পরিণতি অনুধাবন করতে পারে। তার অপমান ও শাস্তিকে একটা ব্যাপক প্রচারণা দেওয়া প্রয়োজন, যেন তার জীবনটা হয়ে পড়ে গ্লানি-ঢাকা ও কালিমালিপ্ত আর তা অপরের কাছে শিক্ষা হতে পারে।

কর : রাজস্ব বিভাগ

কর ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তোমার খেয়াল রাখতে হবে যে, রাজস্বের চেয়ে রাজস্বদাতাদের কল্যাণের গুরুত্ব বেশি। রাজস্বদাতাদের কল্যাণের উপরেই বাদবাকি জনসংখ্যার কল্যাণ নির্ভরশীল। মনে রাখতে হবে যে, পুরো জাতিটাই রাজস্ব আদায়ের উপর নির্ভরশীল।

সুতরাং তুমি রাজস্ব সংগ্রহের চেয়ে জমির উর্বরতার উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করবে, যেহেতু রাজস্ব দেওয়ার ক্ষমতা ভূমির উর্বরতার উপর নির্ভরশীল । যে শাসক জমির উর্বরতা ও জনগণের সমৃদ্ধির উপর নজর না দিয়ে কেবল কর আদায়ের জন্য ব্যগ্র থাকে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে ভূমি, রাষ্ট্র ও জনগণের ধ্বংস ডেকে আনে। তার শাসন বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে না ।

যদি তোমার জনগণ বেশি কর আরোপের অভিযোগ আনে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন— অনাবৃষ্টি, সেচ ব্যবস্থার বিপর্যয়, পোকার আক্রমণ, বন্যা ইত্যাদির শিকার হয়ে পড়ে, তাহলে তুমি তাদের কষ্ট অশেষ সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবে এবং তাদের অবস্থার উন্নতির স্বার্থে তাদের কর যথাযথ অনুপাতে কমিয়ে আনবে। এটা তাদের কষ্ট লাঘবে অবদান রাখবে ।

ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় তহবিলের সঙ্কোচন যেন তোমাকে বিচলিত ন করে, কেননা একজন শাসকের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে জনগণকে তাদের সংকটের সময় সাহায্য করা।

বস্তুত করদাতাগণ হচ্ছে একটা দেশের প্রকৃত সম্পদ এবং যে কোন বিনিয়োগই তোমার নগরী তথা সমগ্র জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে তারা ফিরিয়ে দেবে। তাদের রাজস্বের সাথে সাথে তুমি তাদের ভালোবাসা, সম্মান ও প্রশংসা লাভ করবে। ন্যায় ও সততা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রকৃত তৃপ্তির আস্বাদ লাভ করবে। এটাই কি স্থায়ী সুখ নয় ?

এদেরকে স্বস্তি উপহার দিয়ে তুমি তাদের সমৃদ্ধির সময় তোমার বিনিয়োগটা উদ্বৃত্ত হিসেবে ফেরত পেতে পারো এবং প্রয়োজনের সময় তা কাজে লাগাতে পারো। তোমার সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ, বদান্যতা, মহানুভবতা ও ন্যায় বিচার এক ধরনের নৈতিক প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করবে এবং তাদেরকে সততা ও ন্যায়ের সাথে অভ্যস্ত করে তুলবে। একটা সুখী ও সমৃদ্ধ জনসমষ্টি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এবং তোমাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করবে ।

আসলে এ ধরনের জনগণ হবে তোমার শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। যখন তুমি কোন অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের মুখোমুখি হবে এবং তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হবে, তারা আনন্দের সাথে তোমার বোঝার অংশীদার হবে। একটা সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী যে কোন বোঝা বইতে পারে, কিন্তু দরিদ্র জনগণ হচ্ছে একটা দেশের অধঃপতন ও ধ্বংসের মূল কারণ ।

গভর্নর ও কর্মকর্তাদের অর্থোপার্জনের প্রতি মোহ, তা সৎ বা অসৎ যে কোন পন্থায়ই হোক, দারিদ্র্যের একটা কারণ হতে পারে। যদি তারা কেবল তাদের পদ হারাবার ভয়ে অস্থির থাকে তাহলে তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে যতটুকু বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব তার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে দেবে। তারা কখনই বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, আর আল্লাহ্র বাণী নিয়ে মাথা ঘামায় না।

সচিবালয়

যারা নির্দেশসমূহ জারি করে থাকে ঐ সমস্ত কর্মকর্তার প্রতি তোমাকে গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। তোমার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত ও অন্যান্য গোপনীয় ব্যাপারে তাদের মধ্য হতে যোগ্যতমদের বাছাই করে ঐ দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে।

এ সমস্ত ব্যক্তির নির্বাচনের পর তাদের হাতে তোমার চিঠিপত্র, গোপনীয় দলিলপত্র ও পরিকল্পনার কাজ করতে দাও। তাদের অবশ্যই সৎ, চরিত্রবান ও নীতিবান হতে হবে যেন ক্ষমতা ও পদমর্যাদা তাদেরকে জনসমক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে বলতে, তোমার আদেশ উপেক্ষা করতে, মিথ্যা প্রচারণা চালাতে ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি তোমার কাছে হাযির করতে বিলম্ব করার সাহস না হয়।

তারা যেন কিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র ও বিষয়বস্তু নিয়ে অহেতুক বিলম্ব না ঘটায়। যখন কর্মকর্তাবৃন্দ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তি করতে যায় তুমি লক্ষ্য রাখবে যেন ঐ সমস্ত চুক্তি ত্রুটিহীন হয় এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী না হয়।

রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কোন চুক্তি বা আলোচনায় যেন তারা না যায়। যুক্তির কাঠামো কিংবা ষড়যন্ত্রের কারণে যদি রাষ্ট্রের অবস্থান হয়ে ওঠে দুর্বল, তাহলে এ সমস্ত চুক্তি ও আলোচনাকে বাতিল করে দেবার মতো শক্তি যেন তাদের থাকে।

তোমার অফিসারদের অবশ্যই আপন পদমর্যাদা, প্রশাসনে তাদের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত থাকতে হবে, কেননা যদি কেউ তার আপন অবস্থান ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না থাকে তাহলে সে কখনো অন্যদের সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে না ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নির্বাচনের জন্য তুমি শুধু তোমার আপন বিচার ক্ষমতা ও ভালো ধারণার উপর নির্ভর করলে চলবে না; কারণ তুমি সামান্য ক’টি ক্ষেত্রেই শুধু তাদেরকে সৎ, বুদ্ধিমান, যোগ্য ও বিশ্বস্ত দেখতে পেয়েছ।

তোমার ভুলে গেলে চলবে না যে, কিছু লোককে যদিও সৎ ও বিশ্বস্ত মনে হয়, আসলে তারা ধার্মিকতার পোশাকে শাসক ও উচ্চপদস্থদের হৃদয় জয় করে নেয় । তারা তাদের প্রশংসা এবং স্বীকৃতিও লাভ করে যদিও তারা বিচক্ষণ কিংবা বিজ্ঞ কোনটাই নয়, আর তাদের অন্তরে বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার লেশমাত্র নেই ।

অফিসার বাছাইটা নির্ভর করা উচিত পূর্ববর্তী শাসনামলের সার্ভিস রেকর্ডের উপর। যোগ্যতা ও সততার সুনামের উপরেই তোমাদের অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করতে

হবে।

তোমার সরকারে বিভিন্ন বিভাগে প্রধানরূপে নিযুক্ত করবে এমন সব লোককে জটিল সব সমস্যার সমাধানের জন্য, যাদের যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রজ্ঞা রয়েছে এবং যারা কঠোর পরিশ্রম করতে সক্ষম। সমাজে অবশ্যই তার সততার জন্য সুনাম থাকতে হবে।

এমন সব কাজ আল্লাহ্ ও যিনি তোমাকে নিযুক্ত করেছেন তাঁর প্রতি তোমার আনুগত্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়াবে। তোমার প্রধান কার্যালয় সেক্রেটারিয়েটের প্রত্যেকটা বিভাগে নিয়োজিত ব্যক্তিদের অধিক ক্ষমতাবান করা যাবে না এবং তারা যেন আপন দায়িত্বের চাপেই ন্যুব্জ থাকে ।

যদি তোমার কর্মকর্তাদের কোন ভুলত্রুটি থাকে আর তুমি যদি তার সংশোধনে উপেক্ষা প্রদর্শন করতে থাক তাহলে তাদের সমস্ত ত্রুটি ও অপকর্ম তোমারই উপর বর্তাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কাজের জন্য তোমাকে দায়ী করা হবে।

ব্যবসায়ী, কারিগর ও শিল্পপতিবৃন্দ

আমি তোমাকে ব্যবসায়ী, কারিগর ও শিল্পপতিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার এবং তোমার অফিসারদেরও একই আচরণ করার নির্দেশ দেওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। তারা হতে পারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা দেশের মধ্যেই ব্যবসা চালায় আর বাকিরা দেশ-বিদেশে আমদানী-রফতানীর কাজে নিয়োজিত থাকতে পারে।

একইভাবে রয়েছে কারিগর, নির্মাণকর্মী ও শিল্পপতি। তাদের সবার সাথে ভালো ব্যবহার করা উচিত এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তারা সবাই তোমার সহানুভূতি, নিরাপত্তা ও সদাচরণের উপযুক্ত। তারা হচ্ছে একটা দেশের সম্পদের উৎস। তারা যে দ্রব্য সরবরাহ করে, তাই জনগণ তাদের অভাব মোচনের কাজে ব্যবহার করে ।

এই সমস্ত লোক বহু দূরদেশ হতে দুস্তর মরু, দুর্লংঘ গিরি আর দুর্গম পথ যেখানে সাধারণ মানুষ যেতে সাহস পায় না, সেখান থেকে পণ্য-সামগ্রী বয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং তারা দেশের অভ্যন্তরে হোক কিংবা বাইরের সাথে হোক তুমি তাদের সুবিধের দিকে নজর দেবে।

সাধারণভাবে তারা একটা শান্তিপ্রিয় ও আইনানুগত সম্প্রদায়, তারা সাধারণত দুষ্কৃতি ও ধ্বংসকর কাজে লিপ্ত হয় না।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সম্পর্কে আরেকটা দিক তোমাকে আমার স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তাদের প্রতি সম্পূর্ণ সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার করার সাথে সাথে তুমি তাদের প্রতি একটা সজাগ দৃষ্টি রাখবে। যেহেতু তারা প্রায়শই চরম স্বার্থপর ও সাংঘাতিক কৃপণ, সম্পদলিপ্সু এবং মজুতদারীর প্রবণতাসম্পন্ন ।

তাদের মধ্যে রয়েছে মজুতদাররা ৷ মজুতদারী ও কালোবাজারীর মাধ্যমে এসব মজুতদার জনগণের জন্য দারিদ্র্য ডেকে আনে এবং প্রশাসক ও কর্মকর্তাদের দুর্ণাম সৃষ্টি করে। সুতরাং তুমি অবশ্যই মজুতদারী ও কালোবাজারীর সমাপ্তি আনবে যা পবিত্ৰ নবীজী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের দ্বারা নিন্দিত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

কোন রকমের বিঘ্ন সৃষ্টি ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয়ের একটা সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে হবে। সমগ্র দেশের জন্য তোমার ওজন ও মাপের একক থাকতে হবে। এমন কোন আইন বা শর্ত থাকা উচিত নয়; যাতে ভোক্তা বা সরবরাহকারীর ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশংকা রয়েছে ।

তাদের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত সুবিধে দেওয়ার পরও যদি তোমার আদেশ লংঘন করে ব্যবসায়ী, কারিগর ও নির্মাতারা মজুতদারী ও কালোবাজারীর আশ্রয় নেয় তাদের বিচার ও সাজা হওয়া আবশ্যক। কিন্তু সেখানেও শাস্তিটা হবে অপরাধের গুরুত্ব অনুপাতে এবং কোনক্রমেই যেন তা সভ্যতা ও ন্যায়ের সীমা না ছাড়িয়ে যায়।

গরীবদের অধিকার

গরীবদের ব্যাপারে আমি তোমাকে সাবধান করে দিতে চাই। আল্লাহকে ভয় কর এবং গরীবদের অবস্থা ও তাদের প্রতি তোমার মনোভাবের ব্যাপারে যত্নবান হও। এই সমস্ত লোকের কোন সম্পদ নেই, সুযোগের অবারিত দ্বার নেই; তাদের কোন সহায়ও নেই।

এই শ্রেণীটা হচ্ছে দুস্থ, দরিদ্র, ভিক্ষুক, অসুস্থ ও সহায়হীন, যারা হয় ভাগ্যের হাতে নিজেদের সঁপে দিয়েছে নতুবা ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছেন যারা আত্মসম্মানবোধের খাতিরে ভিক্ষার আশ্রয় নেন না, কিন্তু তাদের দুঃখ- দুর্দশা আরো করুণ ।

মালিক, কেবল আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে একজন শাসকের জন্য তুমি আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব হিসেবে তাদের নিরাপত্তা দেবে এবং তাদের অধিকার রক্ষা করবে। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে তুমি তাদের জন্য একটা অংশ নির্ধারণ করে দাও। এই অর্থ সাহায্য ছাড়াও রাষ্ট্রীয় জমিতে উৎপন্ন ফসলের একাংশ তুমি তাদের জন্য নির্ধারণ করে দেবে।

মনে রাখবে, এ সমস্ত উদ্বৃত্ত সম্পদে অবস্থানের দূরত্ব নির্বিশেষে সকল বাসিন্দার অধিকার সমান ।

জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

আমি আবারো তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, গরীবদের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব তোমার। খেয়াল রাখবে, পদমর্যাদা ও সম্পদের জিম্মাদারিতে তোমাকে তোমার গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দায়িত্বগুলো সম্পর্কে অন্ধ না করে দেয়।

তোমার পদটা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, তুমি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলী নিয়ে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও এবং তাতে সফল হবার পরও সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য তোমাকে ক্ষমা করা হবে না।

অতএব গরীবদের কল্যাণের ব্যাপারে তোমার সতর্ক থাকতে হবে। আর কক্ষণই অহংকার ও ঔদ্ধত্যের বশে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না ।

যারা সহজেই তোমার কাছে আসতে পারে না তাদের বিষয়ে অবশ্য তুমি যত্নবান হবে। তারা হচ্ছে এমন সব ব্যক্তি সমাজ যাদেরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখে, যাদের দারিদ্র্য ও অসুস্থতা তোমার চোখে বিস্বাদ ঠেকতে পারে। এ সব দুর্ভাগা লোকদের জন্য তোমার হওয়া উচিত ভালোবাসা, স্বস্তি ও শ্রদ্ধার উৎস।

কেবল তাদের উপরে আস্থা স্থাপন করবে যারা ধর্মপ্রাণ, মুত্তাকী এবং শোষিতের স্বার্থে আন্তরিকতাপূর্ণভাবে নিবেদিত এবং যারা তোমাকে তাদের সম্পর্কে অবহিত রাখবে।

এমন দুর্ভাগাদের প্রতি অবশ্যই তোমার ভালো ব্যবহার করতে হবে, যেন আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য যখন তুমি লাভ করবে, তখন তোমার আচরণ সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পার ।

মনে রাখবে, মানবতার এ শ্রেণীটিই তোমার নাগরিকদের মধ্যে সর্বাধিক সহানুভূতি লাভের যোগ্য। সুতরাং তাদের প্রতি বিশ্বস্ত ও সম্পূর্ণভাবে কর্তব্য পালন করার মাধ্যমে তুমি তোমার স্রষ্টার সম্মুখে মুখ উজ্জ্বল করে দাঁড়াতে পারবে।

অধিকাংশ শাসকের কাছেই এসব দায়িত্ব প্রতিপালন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। যারা আল্লাহ্র পথে চলে এবং তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করে, আল্লাহ্ তাদের কাজকে সহজ করে দেন।

তারা একটা দায়িত্ববোধ ও আনন্দ নিয়ে তাদের কর্তব্য সমাধা করে। তারা তাদের কাজে আনন্দ পায় এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।

জনগণের অভিযোগ শোনা

অন্যান্য কাজের ফাঁকে কিছুটা সময় তুমি দরিদ্র ও মজলুমদের জন্য বরাদ্দ করে রাখ এবং তোমার সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ শুনবার ব্যবস্থা কর ।

এ শ্রুতির সময় আল্লাহ্ ওয়াস্তে তুমি তাদের সঙ্গে দয়া, সৌজন্য ও সম্মানের সাথে ব্যবহার কর। তোমার সরকার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা যেন খোলাখুলিভাবে নিঃসংকোচে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারে, তার স্বার্থে তোমার কর্মচারী সৈনিক বা প্রহরীকে ঐ সময় সেখানে উপস্থিত থাকতে দিও না ।

এটা তোমার প্রশাসনের জন্য অত্যাবশ্যক। আমি নবীজীকে বলতে শুনেছি, “ঐ সব সরকার ও ব্যক্তি মুক্তি অর্জন করতে পারে না যাদের কারণে দরিদ্র ও দুস্থদের অধিকার শক্তিমানদের হাত থেকে রক্ষিত হয় না। ”

এ সব আসরে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ ও দুস্থরা মিলিত হবে তাদের মধ্যে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের কমতি থাকলেও তাদের প্রতি কড়া বাক্য কিংবা বিব্রতকর উক্তি প্রয়োগ করো না। তাঁদের প্রতি রুক্ষ ব্যবহার করে তোমার দম্ভ ও সংকীর্ণ মানসিকতা প্রদর্শন করো না ।

তুমি যদি তাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হও তাহলে দয়াময় আল্লাহ্ তোমাকে তোমার আনুগত্যের জন্য বিরাট পুরস্কার প্রদান করবেন। তাদের অভিযোগ মনোযোগের সাথে শোন এবং তাদের প্রতি সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার কর।

যদি তুমি তাদের প্রতি ‘না’ বলতে বাধ্য হও তাহলে তুমি তোমার অক্ষমতা এমন মধুরভাবে বলবে এবং এতোটা সৌজন্য প্রকাশ করবে যে, তোমার ‘না’ বলাটাও তাদের কাছে ‘হাঁ’ বলার মতোই সুখকর ঠেকে। তোমার প্রত্যেকটা সাহায্য ও উপহারই আন্তরিকতাপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন ।

এমন কিছু বিষয় থাকবে যেগুলো তোমার কোন অফিসারই করতে সক্ষম হবে না, এগুলো তুমি নিজেই সম্পন্ন করবে। তোমার প্রতিনিধি ও প্রশাসকদের প্রতি উত্তর দেওয়াটা, যেগুলো তোমার সচিবদের ক্ষমতার বাইরে, সেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত।

যখন তুমি অনুভব করবে যে, তোমার অফিসাররা জনগণের অভাব-অভিযোগের প্রতি ততটা সচেতন বা আগ্রহী নয়, তখন তুমি নিজেই এতে আপন মনোযোগ নিবদ্ধ করবে।

প্রতিটি দিনের জন্যই তোমার কিছু আবশ্যকীয় দায়িত্ব থাকবে। সুতরাং দিনের কাজ দিনেই সম্পন্ন করবে।

প্রতিটি দিনই তোমার জন্য কিছু বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে থাকবে। সময়ের শ্রেষ্ঠতম অংশটি তোমার স্রষ্টা ও তোমার নিজের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে ব্যয় কর।

খেয়াল রাখবে, যেন রাষ্ট্রের প্রতিটা কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। যদি তোমার কাজের মধ্যে তোমার স্বচ্ছ বিবেক কাজ করে, তবেই তোমার জনগণ সুখী জীবন যাপন করবে।

নিয়মিত ইবাদত

তোমার দৈনিক নামায যেন তোমার ঐসব আবশ্যকীয় কাজের তালিকায় থাকে, যেগুলো তুমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে থাক। দিবারাত্রিকালীন ইবাদতের জন্য তোমার অবশ্যই একটা সময় নির্দিষ্ট থাকতে হবে।

তুমি অবশ্যই একনিষ্ঠ ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে তোমার শরীর থেকে ট্যাক্স আদায় করে নেবে। আন্তরিকতাপূর্ণ ও একনিষ্ঠ ইবাদত তোমাকে আল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে।

শরীরের উপর দিয়ে যত ধকলই যাক না কেন, তুমি তোমার কর্তব্যগুলোকে অসম্পূর্ণ ও অবিন্যস্ত থাকতে দেবে না ।

যখন তুমি ইমামতি করতে যাবে তখন লক্ষ্য রাখবে যেন তোমার নামায এতটা দীর্ঘ না হয় যাতে তোমার মোক্তাদিরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিংবা এতটা সংক্ষিপ্ত না হয় যে, তাতে ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থেকে যায় ।

যখন নবীজী আমাকে ইয়েমেনে পাঠালেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, কীভাবে ইমামতি করতে হয়। তিনি বলেছিলেন, “একজন বয়োবৃদ্ধ লোকের মতো নামায পড় এবং ঈমানদারদের প্রতি বিবেচনাসম্পন্ন হও।”

জনগণের সাথে যোগাযোগ

তুমি কোনক্রমেই নিজেকে জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে নেবে না। তুমি ও তোমার জনগণের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য সৃষ্টিকারী একটা ব্যূহ রচনা করো না ।

এ ধরনের অহংকার হচ্ছে আসলে অন্তঃসারশূন্যতা, দুর্বলতা ও হীনম্নন্যতাবোধের বহিঃপ্রকাশ যা তোমাকে নাগরিকদের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখবে এবং এছাড়াও তোমাকে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার পটভূমি সম্পর্কে অন্ধ করে তুলবে।

ফলে তুমি বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনাবলীর আপেক্ষিক গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হবে এবং ছোট বিষয়কে বড় এবং বড় বিষয়কে ছোট করে দেখা আরম্ভ করবে। এ ছাড়াও তুমি মাঝারি রকমের যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করে গুরুত্বপূর্ণ লোকদেরই উপেক্ষা করতে পার ।

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি দোষ ও গুণের মধ্যকার পার্থক্য বোধ বিস্মৃত হতে পারো, খারাপকে ভালো আর ভালোকে খারাপ মনে করতে পারো কিংবা দুটো গুলিয়ে ফেলতে পারো, ফলে সত্যটা দ্ব্যর্থবোধক হয়ে গিয়ে একটার স্থানে সহজেই অপরটা প্রতিস্থাপন করা হতে পারে ।

আসলে অন্য যে কোন মানুষের মতোই সে একজন মানুষ আর তাই সাধারণ জনগণ যে জিনিসটাকে তুলে ধরতে চায়; এবং অফিসাররা যেটা গোপন রাখতে চেষ্টিত, সে বিষয়টা সম্পর্কে অসচেতন থেকে যেতে পারে ।

এভাবে সত্য মিথ্যার সাথে মিশে একাকার হয়ে যেতে পারে। আর যেহেতু সত্যের কোন আলাদা রং নেই, তাই একে মিথ্যা থেকে কিছুতেই আলাদা করা না-ও সম্ভব হতে পারে ।

সত্যে উপনীত হবার জন্য সত্যকে খুঁজতে হবে এবং কাহিনীর স্তূপ থেকে বাস্তবকে খুঁজে বের করতে হবে। কেবল এভাবেই সত্যকে পাওয়া সম্ভব।

নিজের সম্পর্কে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হও। তুমি কেবল দু’ধরনের শাসকদের শ্রেণীতে পড়তে পারো। সৎ, পরিশ্রমী, আল্লাহভীরু, সাম্য ও ন্যায় নীতির উপর দৃঢ়, সঠিক সময়ে কাজ সম্পাদনকারী, অপরের অধিকারের সংরক্ষক এবং তোমার উপর অর্পিত সমস্ত দায়িত্ব পালনকারী। তাই যদি হয়, তাহলে কেন তুমি নিজেকে জনগণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে আর নিজের চারপাশে বাধার প্রাচীর গড়ে তুলবে ?

অপর শ্রেণীর প্রশাসক কৃপণদের শ্রেণী যারা অপরের অধিকার স্বীকারে অনিচ্ছুক, তাদের অন্তর্ভুক্ত হলেই কেবল তা তুমি করতে পারো। তুমি কি নীচতার শিকার ?

যদি তাই-ই হয়ে থাকে তোমার মনে রাখা উচিত যে, জনগণ তোমার আচরণ ও মনোবৃত্তি জানতে সক্ষম হবে, তারা শুধু প্রথম কয়েক দিনের জন্যই তোমার কাছে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত তোমার কাছে কোন আবেদন বা অনুরোধ নিয়ে আসবে না ।

একথা ভুলে যাবে না যে, তোমার বিবেচনার জন্য পেশ করা তাদের অধিকাংশ আবেদন তাদের স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত নয়। এগুলো হবে জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কিত এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং সততা, ন্যায়নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আবেদন। তাহলে কেন তুমি তাদের অভিযোগ শোনা এড়িয়ে চলবে ?

আত্মীয় ও বন্ধুদের প্রভাব

এটা ভুললে চলবে না যে, মাঝে মাঝে শাসকদেরও আপন আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জন থাকে যারা তাঁকে ঘিরে তাদের সম্পর্কের সুবিধা আদায় করতে চায়। তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা চক্রান্ত, ধোঁকাবাজি, দুর্নীতি ও জুলুমের আশ্রয় নিতে পারে ।

তাদের কাউকে যদি তুমি কাছে দেখতে পাও, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠভাবেই তারা তোমার সাথে সম্পর্কিত হোক না কেন, তাদের তাড়িয়ে দাও। দুষ্কৃতির গোড়া এবং আগা দু’টাই তোমার সমূলে উৎপাটন করে ফেলতে হবে। কোন প্রকার কালক্ষেপণ না করে তোমার আশে-পাশের এসব নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আবর্জনা সাফ করে ফেলতে হবে।

তোমার সমর্থক ও আত্মীয়দেরকে কখনো ভূমির স্থায়ী ইজারা বা মালিকানা প্রদান করবে না। পানির উৎসগুলো এবং সমাজের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় জমিগুলোকে কিছুতেই তাদের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেবে না ।

যদি তারা এ ধরনের সম্পদের অধিকার পেয়ে বসে, স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের প্রতিবেশীদের বা তাদের অংশীদারদের সেচ সুবিধায় হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে তাতে সমস্ত অবৈধ মুনাফা লাভ করে তোমার জন্য এ দুনিয়ার জীবনে দুর্ণাম ও অপমান এবং পরবর্তী জীবনের জন্য শাস্তি বয়ে নিয়ে আসবে ।

যথাযোগ্য ন্যায়বিচার কর। যারা শাস্তির উপযুক্ত তাদের শাস্তি দাও, তারা তোমার আত্মীয়ই হোক বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হোক, তোমাকে অবশ্যই দৃঢ় ও সতর্ক থাকতে হবে, অন্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি তোমার আপন লোকজনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাতে ভ্রূক্ষেপও করো না। এ ধরনের কাজ তোমার জন্যে বেদনাদায়ক হতে পারে। এ ধরনের দুঃখ ও বেদনা সহ্য কর এবং পরবর্তী জগতে যে কল্যাণ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তার প্রত্যাশা করতে থাক। এগুলো কষ্টকর ঠেকতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটাই তোমার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

জনগণের আস্থা

যদি তোমার কড়া পদক্ষেপের কারণে তোমার নাগরিকরা ভুল করে তোমার উপর ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ আনে তাহলে তুমি তাদেরকে কাল বিলম্ব না করে তাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করার জন্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহকারে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করবে, যেন তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এটা একদিকে তোমার মানসিক প্রশান্তি অপর দিকে জনগণের প্রতি আন্তরিক দরদ ও সহানুভূতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। তোমার প্রতি তাদের এ আস্থাবোধই তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে, আর এভাবেই তুমি সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদের সমর্থন লাভের লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে এবং কল্যাণের পথে তাদেরকে পরিচালিত করার জন্য সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তি লাভ করবে।

শান্তি ও সন্ধি

তোমার শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা কোন শান্তির আহ্বানই তুমি প্রত্যাখ্যান করবে না, যদি তা আল্লাহ্র ইচ্ছা ও সন্তোষের পরিপন্থী না হয় ।

এ ধরনের শান্তি বা সন্ধি তোমার সেনাবাহিনীর জন্য বিশ্রাম ও স্বস্তি এনে দেবে, এটা তোমাকে উদ্বেগ ও আশংকা থেকে মুক্ত করবে এবং দেশ ও জনগণের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়ন করবে।

কিন্তু একই সাথে এ ধরনের চুক্তির পর তুমি সব সময় সতর্ক থাকবে এবং তোমার শত্রুদের প্রতিশ্রুতির উপর খুব বেশি আস্থা স্থাপন করবে না। তারা তোমাকে ধোঁকা দিয়ে তাদের প্রতি তোমার অতিরিক্ত আস্থাশীলতার ফায়দা লুটে নেওয়ার চক্রান্ত এঁটে রাখতে পারে ।

অতএব তোমার সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত এবং অতি বিশ্বাস স্থাপন এড়িয়ে চলা উচিত । তা সত্ত্বেও তুমি কখনোই তোমার কথা থেকে ফিরে যাবে না এবং তোমার প্রস্তাবিত সহযোগিতা ও নিরাপত্তা অব্যাহত থাকবে। সন্ধির শর্ত তোমার ভঙ্গ করা উচিত নয় । জীবনের যে কোন হুমকির বিনিময়েও প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করো না, যত কঠিন ঝুঁকিই নিতে হোক না কেন অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিশ্রুতি মেনে চলো ।

মনে রাখবে, আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সমস্ত দায়িত্বের মধ্যে আমাদের প্রতিজ্ঞা পালনের মতো আর কোনটাই এতো গুরুত্বপূর্ণ ও তার নিকট তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্য নয়।

মানুষের মধ্যে আদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও সবাই স্বীকার করে, যে কোন মূল্যেই হোক না কেন প্রতিজ্ঞা অবশ্য পালনীয়।

শুধু মুসলমানরাই নয়, এমন কি কাফেররাও এর মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে অনুধাবন করার কারণে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে তাদের আবশ্যিক কর্তব্য বলে ভাবতো।

সুতরাং তুমি তোমাদের সম্পাদিত সন্ধি, চুক্তি ও প্রতিজ্ঞাসমূহ পালন করার ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান হবে ।

শত্রুপক্ষের প্রতি পূর্বাহ্ণে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ বা চরমপত্র না দিয়ে কখনোই আক্রমণ করতে যাবে না ।

মনে রাখবে, এমন কি শত্রুপক্ষের সাথেও প্রতারণা করার অর্থ আল্লাহ্র সাথেও চাতুরী করা। এর মানে হচ্ছে আল্লাহ্ বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, আর একজন ঘৃণ্য মূর্খ ছাড়া অন্য কেউ এমন গ্লানিময় যুদ্ধে জড়াবে না ।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ প্রতিজ্ঞা, চুক্তি ও সন্ধিকে পবিত্র করে দিয়েছেন, যেহেতু এগুলো মানব জাতির মধ্যে শান্তি আনে। এগুলো হচ্ছে সমস্ত মানুষের সার্বজনীন মতাদর্শ ও সার্বজনীন প্রয়োজনীয়তা।

আল্লাহ্ শান্তিকে প্রত্যেকের জন্যই একটা আশ্রয় ও একটা নিরাপত্তা বানিয়ে দিয়েছেন, তাই চুক্তি বা সন্ধিতে স্বাক্ষর করার সময় কোন মতলব বা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ো না এবং তার মধ্যে নতুন কোন অর্থ খুঁজে আনতে যেও না।

চুক্তির লংঘন

তোমার চুক্তিগুলোতে এমন দ্ব্যর্থবোধক কথা ব্যবহার করো না যার দু’ধরনের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। সন্ধিটি হবে স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট এবং অস্পষ্টতা হতে মুক্ত।

আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা চুক্তির ব্যাপারে তুমি যদি একটি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হও, তাহলে তা পৌরুষের সাথে মুকাবিলা করার চেষ্টা কর, কখনো চুক্তির খেলাফ করো না।

চুক্তির বরখেলাফের মাধ্যমে উভয় জগতেই আল্লাহ্র ক্রোধ ও শাস্তিকে আমন্ত্রণ জানানোর চেয়ে চুক্তি পালন করে ধৈর্যের সাথে সমস্যা ও বিপদের মুকাবিলা করা অনেক ভালো। পরবর্তীতে এটাই তোমার জন্য আল্লাহ্ পুরস্কার নিয়ে আসবে।

রক্তপাত

অহেতুক রক্তপাত ঘটানোর ব্যাপারে সাবধান হও। মনে রাখবে, একটা নির্দোষ ব্যক্তির রক্তপাত ঘটানোর চেয়ে খারাপ আর কিছু নেই। এতে তুমি আল্লাহ্র রহমত থেকে বঞ্চিত হবে, তাঁর শাস্তির পাত্রে পরিণত হবে, তুমি স্বল্পায়ু হবে এবং এভাবে তোমার উপর নেমে আসবে তাঁর রোষানল ।

হাশরের দিন আল্লাহ্ সর্বপ্রথম মানুষ কর্তৃক মানুষের রক্তপাত ঘটানোর হিসাব নেবেন।

সুতরাং তুমি নির্দোষ রক্তপাত ঘটিয়ে তোমার সরকারকে শক্তিশালী এবং তোমার ক্ষমতাকে সুসংহত করতে যেও না। এ ধরনের কাজ তোমার সরকারকে দুর্বল ও ধ্বংস করে দেবে, এমন কি তোমাকে ক্ষমতাচ্যুতও করতে পারে।

যদি তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা কর, তুমি আল্লাহ্র সম্মুখে, আমার বা অন্য কারো কাছে এর কোন কৈফিয়ত দিতে পারবে না। কেননা এ ধরনের অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত জরুরী এবং তা অবশ্যই -মৃত্যুদণ্ড ।

যদি একজন মানুষকে তুমি অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যা কর, কিংবা বিধিসম্মত শাস্তি প্রদানের সময় তোমার চাবুক, তরবারি বা হাত ভুলক্রমে কারুর হত্যার জন্য দায়ী হয়, কিংবা কানের মধ্যে সামান্য একটা শক্তিশালী চড় বা ঘুষিতে কেউ নিহত হয় তাহলে তার উত্তরাধিকারীদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে যত্নবান হও। সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে তোমার পদমর্যাদা যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায় । 

আত্মপ্রশংসা ও আত্মগৌরব

আত্মপ্রশংসা ও আত্মগৌরবকে তোমার অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

তোমার ভালো কাজগুলোর জন্য আপন প্রকৃতির মধ্যে যে অসাধারণ গুণ প্ৰত্যক্ষ কর তার জন্য অহংকার বোধ করো না ।

চাটুকারিতা ও মিথ্যে স্তুতি যেন তোমাকে আত্মাভিমানী করে না তোলে ।

মনে রেখো, তোমার চোখে যেগুলো ভালো ঠেকে সেগুলোর উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং নিজের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রশংসার প্রতি তোমার অনুরাগ শয়তানকে মানুষের মনের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ধার্মিক মানুষের মনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবার একটা সুনিশ্চিত সুযোগ করে দেয়।

এটা অর্জন করা কঠিন যদি না তোমার পালনকর্তার কাছে অবশ্যম্ভাবী প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি তোমার দৃষ্টির সামনে বর্তমান থাকে এবং তাঁর ভয় তোমার প্রত্যেকটা বিবেচনায় প্রাধান্য বিস্তার না করে। দায়িত্ব গ্রহণে তোমার ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তোমাকে এ লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য ব্যাপক সহায়তা দেবে।

অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ

পূর্বতন সরকারগুলো দ্বারা কৃত ন্যায়নীতি ও ইনসাফের ভিত্তিতে করা সুকর্ম, সমাজের কল্যাণে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান, তাদের আইন ইত্যাদি তোমার অবশ্যই মনে রাখতে হবে। পবিত্র কুরআনে বিধৃত আল্লাহ্র আদেশগুলো এবং নবীজীর হাদীসগুলো সব সময় স্মরণ রাখবে। তাঁদের যেভাবে কাজ করতে দেখেছ আর বলতে শুনেছ ঠিক সেভাবে তাদের অনুসরণ করবে।

একইভাবে এ নসীহতনামায় আমি তোমাকে যা শেখাবার প্রয়াস পেয়েছি তা তোমাকে বাস্তবায়ন করতে হবে ।

আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি, যেন তুমি অধঃপাতে না যাও, প্রলোভন থেকে মুক্ত থাকতে পারো এবং সত্যের পথে সুদৃঢ় থাকতে পারো। যদি তুমি বিপথে যাও তাহলে আল্লাহ্ সামনে তুমি কোন ক্ষমা পাবে না ।

পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে এ দোয়া করছি তিনি যেন আমাকে ও তোমাকে তাঁর হিদায়াতের পথে সুদৃঢ় থাকার তৌফিক দান করেন, তাঁর ইচ্ছা ও জনগণের সন্তুষ্টি সাধনই যেন আমাদের যাবতীয় কাজের লক্ষ্য হয়, আমরা যেন ন্যায়ানুগ ইনসাফভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন একটা সুখী ও সমৃদ্ধশীল জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি যা সারা দুনিয়ার মানুষের অনুসরণ যোগে দৃষ্টান্তে পরিণত হয় ।

তাঁর অশেষ দয়া ও রহমত আমাদের উপর বর্ষিত হোক, হে আল্লাহ্, আমাদেরকে শহীদ হবার সৌভাগ্য নসীব করুন; কেননা একমাত্র আপনারই দিকে আমাদের অবশ্য ফিরতে হবে। মহান নবী, তাঁর বংশধর ও অনুসারীদের উপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক ।

ওয়াস সালাম – তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক ।