মঙ্গল-অমঙ্গল ও যাবতীয় শোভাযাত্রায় আমার কোন আগ্রহ নাই। বরং বিতর্কটা হইতে পারে অভিজাত বনাম বাঙালী! অভিজাতরে বাঙালী হিসেবে ভাবলে ভুল করবেন। অভিজাত বরাবরই অভিজাত।
আধন্যাংটো-হাইল্যা ভাতখোর বাঙালীকে অভিজাত দূরসম্পর্কের জ্ঞাতি হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে চায়না। সেজন্যই হাইল্যা-অশিক্ষিত বাঙালীর খসখসে গানকে কোক-স্টুডিও, গান বাংলা সহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে অভিজাতের রুচি মাফিক ঘষে-মেজে নিতে হয়। ৪০০-৫০০ বছরের গ্রামীন মেলাগুলোকে ভুলে, গ্রামকে ভুলে তার জড়ো হতে হয় রমনার বটমূলে।
শহর তাবৎকিছুকে যে ধ্বংস করে তার একটা ছোট্ট উদাহারন দেই। মাদল ব্যান্ডের শ্যাম মানকিন বিখ্যাত হয়েছেন আন্দোলনের কারণে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গান সম্ভবত ‘শাল বৃক্ষের মতো সিনা টান করে সে’। এই গানটা আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের স্বর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, আন্দোলন কর্মীদের শক্তি ও সংহতির যোগান দিয়েছে। এই গানটি যখন মিছিলে গাওয়া হয় তখন একরকম আবার যখন দৃকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামে গাওয়া হয় তখন ভিন্নরকম আবহাওয়া তৈরী করে। বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ও দৃকের কর্ণধার শহিদুল আলমের একটি ফেসবুক লাইভে দেখেছিলাম শ্যাম মানকিন ‘পীরেন স্নাল’ গাইছেন আর দৃকের কর্মীরা বেশ রোমান্টিক মেট্রোপলিটন নাচ নাচছেন। শহিদ পীরেন স্নালের স্মরণের সাথে শহুরে এই নাচ কিভাবে যায় আমি এখন অবধি বুঝিনি।
এই প্রসঙ্গ টানার পেছনে যুক্তিটা হচ্ছে, আবহমান কালের বাঙালী কৃষ্টির সাথে অভিজাতের নির্মিত ব্যাঙ্গোলি কালচারের তফাৎ ঠিক এইরকমের। অভিজাত মাত্রই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। জাহির করতে চায়। রাহী ভাইয়ের তত্ত্বগান শুনলেও ঠিক একই রকম বোধ হয়।
আদি অকৃত্রিম সহজ মরমী বাউলের গান রাহী ভাইয়ের কাছে এসে হয়ে যায় তত্ত্বগান। ভাষার দূর্বোধ্যতা আর স্বরের ব্যাঞ্জনায় চাপা পড়ে যায় সরলতা ফলে এই গান অভিজাতের থিওরী হয়ে উঠলেও আপামরের ‘কালাম’ হয়ে উঠতে পারেনা।
যাহোক কথা হচ্ছিল ‘পেহলা বৈশাখ’ নিয়ে। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে এই অঞ্চলের কৃষ্টির তফাৎ আলোকবর্ষের। যাপন ছাড়া উদযাপন সম্ভব নয়। বাঙলার যাপনকে অস্বীকার করে ‘বাঙালীপনা’র উদযাপন অনেকটা লোকাচারী ধর্মপালনের মতো। লোক দেখানো আচার থাকে কিন্তু বিশ্বাস থাকেনা। ফলে এমন ধার্মিক সমাজের জন্য ভয়ানক হয়ে উঠেন। ধর্ম তার নিজেকে রক্ষা করার ঢাল হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। শোষণের হাতিয়ার আর বৈষম্য সৃষ্টির যন্ত্র হয়ে ওঠে। তেমনি যাপন বিহীন ‘বাঙালীপনা’ও এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে মেরুকরণ হয়। বিভাজন হয়। আওয়াম এর সাথে দুরত্ব সৃষ্টি হয়। অবশ্য এসব হয় অভিজাতের শ্রেণীগত অভিপ্রায়ে। সে যাবতীয় কর্তৃত্ব আরোপের লক্ষ্যেই এই বিভাজনের রাজনীতি জারি রাখে।
বাঙালীপনার নববর্ষে এই অঞ্চলের গ্রামীন মানুষ, তাদের বিশ্বাস এবং যাপনই হয় উপেক্ষিত।
প্রকৃতি জুড়ে এখন শাকের মরসুম। তিতারী, কাঁটা খুরিয়া, বয়রাগি খুরিয়া, উষ্ণি, শুষ্ণি, বথুয়া, সেঞ্চি, ইছা, দুলফি, দুধলীসহ হরেক রকম শাক এখন জন্মাবে আল জুড়ে, উঠোনে, শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের পাড়ে। গ্রামীন মানুষের পাতে বিনা চাষের শাক যাবে। যাবে আমরুল, টমেটো, তেঁতুলের খাট্টা। চইত মাষের খটখটা রইদে মানুষ পরিষ্কার আসমানের দিকে তাকায়ে মেঘের অপেক্ষা করবে। গাছগুলো বছর আবর্তন শেষ করে নতুন পাতা সেজে উঠেছে। চইত মাসের রইদ মাড়ায়ে আসে বৈশাখ। আসে বৃষ্টি। আসে আম, জাম আর কাঠালের কচি ফল। চইত আর বৈশাখে কিছু মেলা হয়। চড়ক পূজা হয়, গাজন হয়, শাক খাওয়ার পার্বণ হয়। প্যাল্কা আর সিদল খাওয়া হয়। এইসবে টিকে থাকেন গ্রামীন মানুষ। তার বৈশাখ আসে চইত মাসের রোদ পার হয়ে!
মেলা জুড়ে বিকিকিনি হয়। মাটির তৈজসপত্র, কাঠের আসবাব, চাষের যন্ত্রপাতি, তাঁতের কাপড় এসব বিকিকিনি হয়। অকৃষি খাতে যুক্ত গ্রামীন মানুষের সাথে কৃষকের অর্থনৈতিক লেনদেন হয় মাঘ থেকে শুরু করে বৈশাখ অবধি চলা এসব মেলায়। নাইওর যাবার যে সামাজিক রীতি তাও চলতে থাকে। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য বাড়ে। কোথাও কোথাও শিন্নি চড়ে।
গ্রাম ধ্বংস করে, কৃষি ধ্বংস করে, গ্রামীন প্রকৃতি ধ্বংস করে নিতান্তই ‘ভোগের’ বাঙালীপনা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। পহেলা বৈশাখ যতোটা না কালচারাল তারচে’ বেশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। শহুরে অভিজাতের হাত ধরেই পহেলা বৈশাখে কর্পোরেট পুঁজি ঢুকেছে।
বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান হয়েছে ‘রুচি নববর্ষ’ কিংবা ‘বসুন্ধরা পহেলা বৈশাখ’। ফলে প্রান্তিক মানুষের উৎসব নাই হয়ে গেছে। প্রান্তিক মানুষ এখন ইস্পাহানি চালের বাজারে আরও প্রান্তিক ও শোষিত। এই আপাদমস্তক প্রক্রিয়ার বাড়-বাড়ন্তের দায় আমাদের উপর।
আমাদের অ-দূরদৃষ্টির ফলে ক্ষতি হয়ে গেছে এ অঞ্চলের মানুষের সহজ বিশ্বাসের, ক্ষতি হয়ে গেছে তাদের কৃষ্টির ও যাপনের। এই ক্ষতি থেকে এ অঞ্চলের মানুষ ক্রমাগত উগ্র ধর্মীয় প্রবণতাগুলোর স্বীকার হয়েছেন। আজকের দিনে বাংলাদেশের মুসলমান নিজেদের আফগানিস্তানের আর হিন্দু ভারতে নাগরিক মনে করার পেছনের বড় কারণ আমার ‘প্রগতিশীল’ দাবিদার বুদ্ধিজীবী(?) শ্রেনীর হঠকারিতা ও নিজেদের মধ্যে আলাদা হবার প্রবণতা। তারা আলাদা হতে গিয়ে বিজাতীয় হয়েছেন। মৌলিক হতে গিয়ে অদ্ভুত হয়েছেন। আস্থা হারিয়েছেন গণমানুষের। নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে আজকের দিনে অতি-অভিজাতের(আল্ট্রা এলিট) অংশ আমাদের প্রগতিশীল ঘরানা সমাজে কেবল বিভাজন বাড়াচ্ছেন। মানুষের বিশ্বাসের সাথী না হয়ে তাকে আরও নিরাপত্তাহীনতার দিকেই ঠেলছেন।
যাদের চিন্তায় গ্রাম নেই, যারা গ্রামের মানুষকে ‘ক্ষ্যাত’ কিংবা মূর্খ হিসেবে গণ্য করেন। চাষা যাদের নিকট গালি তারা যখন বাঙালি সত্ত্বার সত্ত্বাধিকার হিসেবে দাবী করেন, প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন তখন সেটা যে এ অঞ্চলের মানুষকে ভাবিত করে তুলবে সেটাই স্বাভাবিক।
মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে মুখোশ এবং মূর্তি বাদ দিলে যদি এ অঞ্চলের কওমি ঘরানা, মাদ্রাসা ঘরানার সাথে আলাপের জায়গা তৈরী হয়, তারাও যদি এই পদযাত্রায় অংশ নেন তাহলে আমি মুখোশ এবং মূর্তি বাদ দিয়েই পদযাত্রার পক্ষে। আমাদের দেশের মানুষ যে পরিমাণে বিভাজিত সেখানে নতুন করে বিভাজনের ইস্যু এড়ানো গেলে এরচে’ মহৎ অন্যকিছু হইতে পারেনা।
এখানে আরেকটা বড় সংকট হচ্ছে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সংকটকে মুসলমান বনাম বাঙলার সংকট করে তোলার রাজনীতি। এটার শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর হাতধরেই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে আমরা এর অবসান ঘটাতে পারিনাই। বরং দিনকে দিন এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো বিরোধী শক্তিগুলো এতে যেমন ইন্ধন জুগিয়েছে তেমনি আগুনে ঘি ঢেলেছে অতি-প্রতিক্রিয়াশীল প্রগতিশীল ঘরানা। ফলে দিনান্তে লাভটা হয়েছে উগ্র-প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোরই।
০